ময়ূরী মিত্র

পর্ব – দুই
গতপর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছি— ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আগামী উত্তরণের স্বার্থে জনসংযোগ, জনস্বার্থ ও সমস্বর প্রতিবাদের বিষয়টি ক্রমশ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছিল৷ চারণকবি যে এই প্রয়োজন সর্বার্থেই অনুভব করেছিলেন তা বোঝা যায় তাঁর এই সময়কার সবকটি লেখায়৷ সমাজের তথাকথিত নিম্নমানের পেশার মানুষদের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মুকুন্দকবি৷ লিখলেন—
ডেকে নে তাঁতী জোলা
ছাড়িয়ে নেংটি তিলক ঝোলা
খুলে দে তাঁতের মেলা
প্রতি ঘর ঘর
কামার কুমোর চামার মুচি
তারাই কাজের, তারাই শুচি
ধর জড়িয়ে গলা তাদের
ভুলে আপন পর৷৷
স্বরাজের একটি জুতসই সাম্যবাদী ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করলেন মুকুন্দদাস৷ সেকালের প্রেক্ষিতে অভিনব ছিল বৈকি সে ব্যাখ্যা৷ মুকুন্দদাস লিখছেন—
স্বরাজ সেদিন মিলবে যেদিন
চাষার লাগিয়া কাঁদিবে প্রাণ
তাঁদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলায়ে
সপ্তমে তোরা তুলিবি টান৷
মনে হচ্ছে না কী — বঙ্গদেশের জনমন ও মতকে এমন নিবিষ্ট অন্তরঙ্গতায় খুব কম নেতাই বুঝেছিলেন সেদিন? স্বকীয় বিদ্রোহী চেতনায় উদ্বুদ্ধ মুকুন্দদাসের পালাগানে তাই বুঝি বড়ো যত্নে এবং বারবার সাজানো হতো নিম্নবর্গীয় মানুষজনের একটি সক্রিয় ও সমান্তরাল ভূমিকা। এখানে বলে রাখি, ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ ও তাঁর সহযোগীরা Subaltern Studies-এ জাতীয় স্তরের এলিট নেতা ও নিম্নবর্গকে একটু বেশি পৃথক করে দেখালেও বিশ শতকের গোড়া থেকে উভয়ের কর্মধারা ও রাজনৈতিক চৈতন্যের মধ্যে, প্রচ্ছন্ন মাত্রায় হলেও একটা জোট দানা বাঁধতে থাকে। ফলে প্রথামতো রাজনৈতিক শিক্ষা না পেলেও, অশ্বিনীকুমার দত্তের অনুগামী মুকুন্দদাসের বুঝতে অসুবিধে হয়নি বঙ্গের বিপ্লবকে বেগবান করতে গেলে এবার সর্বস্তরের মানুষের এই জোটটিকে — বলা ভালো বঙ্গবাসীর নবলব্ধ Collective Mentality-কে আরো জোরের সঙ্গে বাঁধতে হবে।
বলাবাহুল্য এক্ষেত্রে মুকুন্দদাস তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছু সুবিধা পেয়ে গিয়েছিলেন।
প্রথমত জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, কংগ্রেস বুর্জোয়া না মধ্যবিত্তের— এ নিয়ে ক্রমাগত চলতে থাকা বিতর্ক, কংগ্রেসের নিজস্ব নীতিনিষ্ঠ নিয়ামানুগ চলনবলন কংগ্রেসকে কোনোদিনই ঔপনিবেশিক শোষণে সর্বাধিক অবনত বঙ্গদেশের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেনি। বঙ্গবাসীর সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের মানসিক বিভাজন বঙ্গভঙ্গের কালে আরো বেড়েছিল। এইসময় থেকে আমরা দেখছি— বঙ্গের কী মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী কী সাধারণজন সবাই কিন্তু অতি স্পষ্ট এবং ভিন্নমুখী একটি রাজনৈতিক পন্থা ও প্রক্রিয়া সন্ধানের চেষ্টা করছেন। কখনো স্বরাজ কখনো স্বদেশি কখনো বা নির্বিচার বিপ্লবের মধ্যেই আত্ম-আবিষ্কার ও আত্ম-সমীক্ষায় উদ্যত হচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত কেমব্রিজ-গোষ্ঠী বারবার দেখিয়েছেন — ইংরেজ শাসন, বাণিজ্য, শিক্ষা বিভিন্ন সময়ে ও পরিমাণে বিস্তৃত হওয়ায় ভারতবর্ষের জাতীয়তাবোধ বিকাশে একটা আঞ্চলিক বৈষম্য বরাবর থেকে গিয়েছিল। ঠিক একই তত্ত্ব আমরা ঔপনিবেশিক শোষণের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারি। কারণ ব্রিটিশ ধনতন্ত্রের আক্রমণ বঙ্গদেশে যতখানি ও যেভাবে উদ্দাম হয়ে উঠছিল তেমনটি কিন্তু পশ্চিম ভারতে হয়নি। এজন্যই আধুনিক শিল্প ও বুর্জোয়া শ্রেণির তরতরে বিকাশ সম্ভব হয়েছে বোম্বাই গুজরাট অঞ্চলে — উল্টোদিকে বঙ্গের অর্থনীতিকে ভূমি ও বৃত্তিনির্ভর করে রাখা হয়েছে।
এ হেন দুর্ভাগা দেশে মুকুন্দকবি গলা ছেড়ে গাইছেন—
ওরে ভাই জোলা তাঁতী —
ছাড়রে হিংসা দ্বেষ
কাপড়ে ষাট কোটি টাকা
নিয়ে যায় বিদেশ;
চালা মাক্কু দেশের টাকা
দেশেই রাখা চাই
মাছের বংশ কমে গেছে
পড়ছি বড় ফেরে,
বাংলার বাজার ভরে দিত
মোদের জগৎ বেড়ে;
আমার কেবল শিখতে হবে
মাছের চাষটা ভাই।
মুচির ছেলে আমার কর্ম্ম
জুতো তৈয়ারি,
কিসের চীনা কিসের দিল্লি
কিসের টেনারি ,
হস্তশিল্পের উন্নতি বই
এদেশের মুক্তি নাই।
তাজি ঘোড়ার মতো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটছে তখন মুকুন্দ চারণের গান। ফালাফালা হচ্ছে ব্রিটিশরাজের “Drain Of Wealth” সর্বস্তরের সর্বরকম চালাকি। তারই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক গঠন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সর্বস্তরের মানুষকে সক্রিয় ও নিযুক্ত করার কথা যখন গানে গানে বলতে লাগলেন মুকুন্দ — তাতে বঙ্গবাসী প্রাণের পরশ পাবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। ব্রিটিশ নীতিকে কেমব্রিজ গোষ্ঠীর ঐতিহাসিকদের মতো ‘Prime Mover’ মনে না করলেও এটা অনস্বীকার্য — ভারতীয় সমাজ যে Pluralist বা বহুস্তরে বিভক্ত এ খবর তাঁদের মতো করে আর কেউ রাখতেন না। তাই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে তাঁরা একদিকে যেমন নিচু স্তরের আন্দোলন দমন করে যাচ্ছিলেন, আরেকদিকে উঁচু স্তরে কখনো হিন্দু কখনো মুসলিম সহযোগিতার পথ বেছে নিয়ে বিভেদের বীজ পাকা করেছিলেন। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের এই দুমুখো নষ্টামি উদ্ঘাটিত হয়েছিল বঙ্গের চারণের দৃষ্টিতে।
রাজনৈতিক সুচাতুর্য সঙ্গে নিয়ে মুকুন্দদাস তাই আক্রমণ করলেন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের দুটি মৌলিক ভিত্তিকে। সেইসঙ্গে বিবিধ প্রান্তিক স্তরের বুদ্ধিজীবী মানুষকে শেখালেন কী করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে ধাপে ধাপে চিন্তা করতে হয় এবং একটি Positive সমাধান বের করতে হয়। সম্ভবত এই Positive Approach-এর জন্যই তাঁর গাথা বা কথা ব্রিটিশ সরকারের কাছে শুধুমাত্র প্রতি-জাতিবৈরিতায় সীমায়িত থাকেনি। বরং তা দ্রুত উপনিবেশ বিরোধিতার উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল। সরকারের ভয় বাড়ছিল৷ নাজেহাল রাজা অচিরেই মুকুন্দকে অবরুদ্ধ করে।
কোথায় জানেন?
না মহাশয় কোলকেতায় নয়।
বাংলার গ্রামের কবি বন্দি হলেন সুদূর দিল্লিতে।
কালো মানুষের রোষের ভয় ছেঁকে ধরেছে শ্বেতবরণ রাজাকে।
ক্যায়াবাত!
বাত ক্যায়া?
এরপর?

লেখাটি তথ্যবহুল তো বটেই।
এবং তার ব্যাখ্যাটিও যথাযথ।
পরবর্তীর পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
LikeLike
আজ বৃহত্তর ভারতের প্রেক্ষাপটে বাংলার মনন ও মনীষা অবহেলিত বলে মনে করি। আমার এই মনে করা কোন কল্পনাবিলাশ নয়, জীবিকার তাগিদে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান থেকে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা পেয়েছি তা থেকেই বলছি। তাই এই সমূহ শূ্ন্যতার সময়ে, বাংলার গৌরবময় সময়ের অনুভবের পূনরুজ্জীবনে এমন লেখা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
একরাশ ভাললাগা জানালাম। 🙏
LikeLike