তাপস চক্রবর্তী
লতার প্রয়াণ এর ঠিক ন-দিনের মাথার বাংলার তথা সারা দেশের উজ্বল সন্ধ্যা তারা সুরোলোকে চলে গেলেন৷
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হলেন মঙ্গলবার ১৫ ফেব্রুয়ারি, ঠিক সন্ধ্যায়৷ ৭টা ২০ মিনিটে৷ সাত দশকের ও বেশি, বাঙালী তাঁর গানের যাদুতে মজে ছিল৷ তার ছেদ ঘটলো৷ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এক অসাধারণ গায়কীতে ভরিয়ে রেখেছিলেন দু বাংলার সংগীত জগৎকে৷ শুধু বাংলা কেন, গোটা দেশের উজ্বল সন্ধ্যা তিনি৷ হিন্দি গান থেকে শুরু করে দেশের অনেক ভাষাতেই তিনি গান গেয়ে শ্রোতা দের মুগ্ধ করেছিলেন৷ ধ্রুপদী সঙ্গীত এ ও তিনি সমান পারদর্শী, সমান বললে ভুল হবে দেশের উজ্বল এক গায়িকা বললে সঠিক বলা হবে৷ মিষ্টি কন্ঠস্বর তাঁর কথাতেও গানের মতই ছিল৷
১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর কলকাতার ঢাকুরিয়ায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এর জন্ম, এক গায়কী পরিবারে৷ বাবা নরেন্দ্র মুখোপাধ্যায় সংগীত সাধক৷ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর কাছে প্রথম সংগীত-এর পাঠ শুরু করেন৷ মা হেমপ্রভা তাকে উৎসাহিত করেন৷ উচ্চাঙ্গ সংগীতের নাড়া বাঁধেন তিনি বড়ে গুলাম আলি খানের কাছে৷ সেই থেকে শুরু৷ চিন্ময় লাহিড়ী থেকে ও তিনি আরও সমৃদ্ধ হন৷ উচ্চাঙ্গ সংগীতের সম্মেলন এ তখন তিনি অন্যতম উজ্জ্বল তারকা৷
১৯৪৮ এ প্রথম সন্ধ্যা প্লে ব্যাক গায়িকা৷ মাত্র বাইশ বছর বয়সে অলবেঙল মিউজিক কনফারেন্সে প্রথম৷ একই সঙ্গে আধুনিক, নজরুল গীতি তেও অপ্রতিরোধ্য৷
এর পর দুরন্ত বেগে গানের পথ চলা৷ ভক্তিগীতি, খেয়াল, ভজন ঠুংরি, ভাটিয়ালী সব কিছু তাঁর কন্ঠে৷ ১৯৫৬ সালে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এর সুরে আকাশ প্রদীপ জ্বলে গানটি মাইল ফলক বলা চলে৷ বাংলার ঘরে ঘরে গুন গুন আওয়াজে ভরে উঠলো৷ এর পর, সলিল চৌধুরি, রবীন চট্টোপাধ্যায়, শচীন কর্তা, অনুপম ঘটক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, পঙ্কজ মল্লিক, নচিকেতা ঘোষ মানবেন্দ্র, আরও অনেক সুরকার এর সুরে গেয়ে মাৎ করেছেন গানের জগৎ৷ রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে, ওগো মোর গীতিময়, অনুপম ঘটকের সুরে ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি, এছাড়া মধুমালতী ডাকে,যদি নাম ধরে তারেই ডাকি, মায়াবতী মেঘে এলো তন্দ্রা, পিতা পুত্র ছবির সেই অমর গান,তীর বেঁধা পাখী আর গাইবেনা গান৷ এখনো শিহরিত করে সংগীতপ্রেমী মানুষের মনে৷ কত গানের কথা বলি! মহিষাসুরমর্দীনী সেই গান, বিমানে বিমানে আলোকের সমানে জাগিলো ধ্বনী কি ভোলা যায়!
হিন্দিতে ১৭ টি গান গেয়েছেন৷ তাও অনবদ্য৷ আধুনিক, ছায়াছবি মিলিয়ে কত যে গান গেয়েছেন তার হিসেব দিতে গেলে পাতাটাই ভরে যাবে৷ তবুও ভূলতে পারি না মানবেন্দ্রর সুরে জয়জয়ন্তী ছবির গান ৷ শতাব্দীর এই আকাশ প্রমান গায়িকা আকাশেই মিলিয়ে গেলেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়৷ নশ্বর দেহটি শুধুমাত্র রয়ে গেল৷ রেখে গেলেন অজস্র গানের ডালি৷
উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা ছবির জগৎকে সাবালক করে তুলেছেন একই ভাবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গানের জগৎকে সাবালক করেছেন৷ সঙ্গে ছিলেন অন্য সারথীরা৷ হেমন্ত, মান্না দে,শ্যামল মিত্র, অন্য গায়কেরা ৷সায়গল সময় যেভাবে সংগীত গাওয়া হত সেই ছক এক দিন এরাই আধুনিকতার ছোঁয়ায় অন্য এক মাত্রা এনে দিয়েছিলেন৷ তাই সম্ভবতঃ এদের গানের সময়কে স্বর্ণ যুগ বলে চিহ্নিত করা হয়৷ এই যুগকে তিনি বহন করেছেন৷ উত্তম-সুচিত্রা রোমান্টিক জুটি অন্য এক মাত্রা এনে দিয়েছিল৷ সুচিত্রা মানেই সন্ধ্যা, উত্তম মানেই হেমন্ত৷ পরে অন্য জুটির লিপে ও তিনি অনায়াসে গেয়ে অভিনন্দন কুড়িয়ে নিয়েছিলেন৷ তার উদাহরণ এন্টনি ফিরিঙ্গি, দেয়া নেয়া, জয়জয়ন্তী নিশিপদ্ম ছবি৷ বাঙালির নষ্টালজিক অনুরোধের আসর৷ সেখানেও তিনি মধ্যমণি৷
ঢাকুরিয়ার বাড়িতে গীতিকার শ্যামল গুপ্তের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন৷ তার পর থেকে শ্যামল গুপ্তের লেখায় বহু গান গেয়েছেন৷ ৯০-এর সন্ধ্যা, তখনও গানের রানি৷ হঠাৎই ছন্দপতন৷ ২৩ জানুয়ারি শৌচাগারে পড়ে যান৷ উরুর হাড় ভেঙে যায়৷ অসুস্থ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি হল৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উদ্যোগে৷ ধরা পড়ে করোনা, পরে তাঁকে আরো ভালো চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ পরে করোনা মুক্তও হন৷ উরু অস্ত্রোপচার করা হয়৷ কিন্তু মঙ্গলবার তাঁর শারীরিক সমস্যা বাড়ে৷ রক্তচাপ কমে যায়, অবশেষে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হন৷ তখন ঠিক সন্ধ্যা ৭টা ২০৷ অগণিত মানুষের কাছে এই খবর পৌঁছতেই শোকের ছায়া নেমে আসে৷ রাতে পিস হেভেনে তাঁর মরদেহ রাখা হয়৷ বুধবার সকালে সংগীত আকাদেমি হয়ে রবীন্দ্র সদনে সাধারনের জন্য তাঁর মরদেহ শায়িত রাখা হয়৷ মুখ্যমন্ত্রী সহ বিশিষ্ট ব্যক্তি মাল্যদান করেন৷ গানসালুট দিয়ে সম্মান জানানো হয়৷ সন্ধ্যায় সন্ধ্যা তারা বিলীন হয়ে যায় আকাশে অন্য তারার ভীড়ে৷ কানে আসছে ৭০ বছর ধরে শোনা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এর গান ৷

