মেরিটে চাকরি Vs পয়সা দিয়ে চাকরি

মৌমিতা ঘোষ

আগের তিনটে পর্বে তিনটে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয় যা আমার জীবনে আমি উপলব্ধি করেছি, লিখেছি। আমি যে অঞ্চলে বড় হয়েছি সেখানে বিশাল সংখ্যক মানুষ সংখ্যা একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের। তাদের ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করেছে বাংলার সব সরকার, কিন্তু কেউ চাননি সেই সম্প্রদায়ের শিক্ষার প্রসার হোক। তারা নিজেরাও চাননি। তারা জ্বিন‌-পরী, পীরের দরগা সব কিছুতে নিজেরা বিশ্বাস রাখতে চেয়েছেন যতটা, ততটা শিক্ষায় নয়। তারা ধর্মীয় ভাবাবেগের জন্য যতটা সরব, নিজেদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে ততটা নন। আর সরকার ও ওই নীতি অনুসরণ করেছেন, ‘ওরা যত বেশি জানবে, তত কম মানবে। ‘
নাহলে কোন সরকারই এসব জায়গায় অনেক বেশি সংখ্যক স্কুলের ব্যবস্থা করলেন না কেন?
তবুও অসহিষ্ণুতার মধ্যে একটা সহাবস্থান ছিল। কোনদিনই হিন্দু ও মুসলমান দুটি সম্প্রদায় ‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম’ ছিল না। সেটা রবীন্দ্রনাথের লোকহিতের ওই “স্বদেশী করা ” হিন্দু সংগ্রামী জল খাবেন বলে মুসলমান সহকর্মীকে দাওয়া থেকে নেমে যেতে বলেন, সেই সময়েও ছিল না; আর আমাদের স্কুলের সরস্বতী পুজোয় মুসলমান ছাত্রীরা প্রসাদ খেতো না সেই সময়েও ছিল না। কলকাতার বুকে এখনো একটি হাউজিং সোসাইটি তে মুসলমান নাগরিকের ফ্ল্যাট পাওয়া মুশকিল। দুটো ঘটনা বলি, আমার এক মুসলিম বান্ধবীর দুই ভাই দার্জিলিং এ কনভেন্টে পড়ত। তাদের কথাবার্তা, English accent দেখে আমরা চমৎকৃত হয়ে যেতাম। তারা স্কুলের পর এখানে এসে কলেজেও পড়ল। কিন্তু তারপরেই সেই লুঙ্গি পরে বাবার ওস্তাগারের ব্যবসায় লেগে পড়ল, পান খেয়ে রাস্তায় পিক ফেলতে শুরু করল, আমি খুব ধাক্কা খেয়েছিলাম। লুঙ্গি পরা খারাপ কখনো বলছিনা।তারা যদি MBA করে বাবার ব্যবসাকে সেই শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে সমৃদ্ধ করে একটি বিশাল ব্র্যান্ড বানিয়ে ফেলতো তবে খুশি হতাম। কিন্তু তারা ওই অঞ্চলের আর পাঁচটা ছেলের মতো হয়ে গেল এটাই দুঃখ।সাল ২০০০, যখন ওরা graduate হয়েছিল।আমার বান্ধবী, মানে ওদের বোনকে ওর বাবা মোটেও বিয়ে দিতে চাননি। পাড়া-প্রতিবেশী রীতিমতো চাপ দিতে লাগলো। দরজায় ধাক্কা পড়লেই ওরা ভয় পেতেন, কেউ না কেউ সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে। সালটা ১৯৯১। নাইনে পড়া মেয়ের বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন বাবা। এই দুটি ক্ষেত্রেই ওর দুই ভাই ও বোন সমাজের , আত্মীয় স্বজনের চাপের শিকার।কেন পড়বে? সাহেব বানাবে? খ্রিষ্টান স্কুলে পড়িয়েছ, এখন আদব কায়দায় খ্রিষ্টান বানাবে?
আর এর থেকে যদি কেউ পালাতে চান, যেমন আমার এক ক্লায়েন্ট যাকে আমি ইনসিওরেন্স বিক্রি করেছিলাম ছেলে মেয়ের উচ্চশিক্ষার প্ল্যান করার জন্য, তিনি লিটারালি ছেলে মেয়েকে ভালো পড়াশোনা করাবেন আর পিছিয়ে পড়া কালচার থেকে দূরে রাখবেন বলে ফ্ল্যাট কেনেন বেহালায়। সাল ২০১৪।অর্ধেক পেমেন্ট করে দেওয়া সত্ত্বেও বাকি ক্রেতাদের চাপে তাকে প্রোমোটার টাকা ফেরত দিয়ে বলেন ” হবে না আপনার এখানে ফ্ল্যাট নেওয়া।” তার বেশ ভালো অঙ্কের টাকা নানা নিয়ম দেখিয়ে কেটেও নেওয়া হয়। অত্যন্ত সজ্জন এই মুসলমান ব্যক্তিটি তার ছেলে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষার আলো দেখাবেন বলে শেকড় উপড়ে আসতে চেয়েছিলেন, পারলেন না। মেইনস্ট্রিম তাকে accept করলো না।এসব বলা পাপ এখন,জানি। আর ঠিক পাশাপাশি মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে হিন্দু নাগরিকের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় অপদস্থ হওয়ার কাহিনীও প্রচুর। আমার সঙ্গে ই এবছর পুজোর সময় হয়েছে।
তবুও একটা সহাবস্থান ছিল। একটা পর্দা ছিল সম্ভ্রমের। আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে কারো বাবা-মা ই খুব একটা বিদ্বেষ ছেলে মেয়েদের মধ্যে ঢোকাতে চেষ্টা করেননি।আমরা দিব্য ঈদের নেমন্তন্ন খেতাম, যাদের বাড়ি যাওয়া হতনা, তারা খাবার দিয়ে যেতেন ও আমাদের খাইয়ে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি পেতেন, যেটা নির্ভেজাল। আমাদের বিয়েবাড়িতে তারা আসতেন। ওই যে বললাম একটা সহাবস্থান ছিল, বিদ্বেষ থাকলেও। ভালো লোককে ভালোই বলতো লোকে পাড়া ঘরে, সে মুসলমানই হোক বা হিন্দুই হোক। তারপর বদলে গেল সব হঠাৎ। বদলানো হল।

সব ধর্মের ধর্মগুরুদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খুব বেশি কাজে লাগানো হল, যাতে জন্ম থেকেই দেওয়া হয় বিভাজনের শিক্ষা। সেইজন্য আমার ই পরিবারের এক ভ্রাতৃবধূ যখন গর্বের সঙ্গে বলল “আমি মেয়েকে শিখিয়েছি স্কুলে আয়েশা, ফাতিমা এসব নাম দেখলে কখনো তাদের টিফিন খাবেনা। ওরা আর আমরা আলাদা। “; আমার মনে হয়েছিল আমি মাটি দুভাগ করে ঢুকে পড়ি। এই ” ওরা আমরার ” শিক্ষা সর্বত্র।
আমাদের শিক্ষা এখন শুধু বিভাজনের। ধনী- দরিদ্র, অ্যাফ্লুয়েন্ট – মিডলক্লাস ; পুরুষ-নারী, উচ্চবর্ণ- নিম্নবর্ণ, ঠাকুর- দলিত, কর্পোরেট-সরকারি, প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষক-সরকারি স্কুলের শিক্ষক- পার্শ্ব শিক্ষক।
বললে শেষ হবেনা।মেরিটে চাকরি Vs পয়সা দিয়ে চাকরি।
আজকাল অণু-পরমাণু বিভাজনে আমরা প্রকৃত দীক্ষিত। আর রাষ্ট্র প্রমোট করে আমাদের এই বিভাজনের শিক্ষা দিয়েছে।আমরাও শুধু একে অপরকে শত্রু ভেবে লড়ে যাচ্ছি, বা না লড়লেও পাশে তো দাঁড়াচ্ছিই না। যে কোন আন্দোলন হলেই কিছুদিন পরে আরেকটা বিভাজন ক্রিয়েট করা হয়। সিটিজেন vs আন্দোলনকারী। কিছু ঘটনা ক্রিয়েট করে অন্য নাগরিকদের মধ্যে একটা ভাবনা তৈরি করে দেওয়া হয়, এই আন্দোলনের জন্য তাদের যাতায়াতে, তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে খুব অসুবিধা হচ্ছে। এরে কয় রাজনীতি। অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ভাবে আমার বাবা সারাজীবন ডানপন্থী রাজনীতি করে এসেছেন, তিনি ঈদের নেমন্তন্ন খেতে গেলে বা ছেলেমেয়েদের কোন বারণ না করলে, নিজের ছেলের বিয়েতে অসংখ্য মুসলমান সহকর্মীকে দাওয়াত দিলেও তাকে কোনদিন শুনতে হয়নি, ” তুই কি স্যেকু? তুই কি মাকু?”
‘স্যেকুলার’ শব্দ টি যে এই ভারতবর্ষে খিল্লি ও গালাগালি তে পরিণত হবে তা এ জন্মে দেখতে হবে, ভাবিনি।
সংবিধান এ যে শুরুতেই লেখা আছে “we are a Sovereign, secular, socialist, democratic country..” এই শিক্ষাটুকু নেই বলে স্যেকুলার একটি খিল্লিতে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষা শুধু স্কুল কলেজের পাঠ্য বই পড়া নয়, শিক্ষা সার্বিকভাবে একটি জাতির চরিত্র গঠনের প্রয়াস, আমরা চরিত্র বলতে যেখানে আজীবন বিছানার বাইরে ভাবতেই শিখলাম না, সে কি কম অশিক্ষা

2 thoughts on “মেরিটে চাকরি Vs পয়সা দিয়ে চাকরি

Leave a comment