তাপস চক্রবর্তী
বিশিষ্ট নাট্যকর্মী, অভিনেত্রী ও নাট্যলেখিকা, পরিচালক শাঁওলি মিত্র গত ১৬ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত দীর্ঘ রোগভোগের পর প্রয়াত হন৷ মাত্র ৭৪ বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়৷ বাংলা, ইংরেজি-সহ বহু ভাষায় তাঁর নাটক নাট্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে৷ প্রয়াত অভিনেতা শম্ভু মিত্র-র কন্যা শাঁওলি৷ মা প্রয়াত তৃপ্তি মিত্র ছোট্ট বেলা থেকে বহুরূপী নাট্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ।
ঘনিষ্ঠ মহলে তাঁর ইচ্ছে ছিল তাঁর মৃত্যুর পর দেহ দাহ করা যেন হয় নিশ্চুপ ভাবে৷ দাহ করার পর জনসমক্ষে খবরটি আনা হয়৷ উল্লেখ্য, শম্ভু মিত্রর মৃত্যুর পর একই রকম ভাবে মৃত্যুর পর খবর জানানো হয় সাধারনের কাছে৷
২০০৩ সালে আকাদেমি, ২০০৯ সালে পদ্মশ্রী ও ২০১২ সালে বঙ্গভূষণ পুরস্কার তিনি পান৷ পঞ্চম বৈদিক নামে একটি নাট্যসংস্থা তৈরি করেন৷ নাথবতী অনাথবৎ নাটকটি ঐ সময় থেকে অভিনীত হয়৷ বিততা বিতংসও তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি৷ এছাড়াও চলচ্চিত্রেও এক উজ্বল ভূমিকা পালন করেন৷ ঋত্তিক ঘটকের ভাঙা বেলা, যুক্তি তক্কো গল্প ছবিতে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন৷ দীর্ঘদিন তিনি বাংলা আকাদেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷ তাঁর মৃত্যুতে নাট্যজগতে অপূরনীয় শূন্যতার সৃষ্টি হল, বললেন বিশিষ্টজনেরা৷
১৭ জানুয়ারি ভারতীয় কত্থক নৃত্যের জনক বিরজমোহন মিশ্র ওরফে পন্ডিত বিরজু মহারাজ প্রয়াত হলেন৷
ভারতে তিনি ছিলেন বিননদাদিন ঘরানার অন্যতম শিল্পী৷ তাঁর দুই কাকা যথাক্রমে শম্ভু মহারাজ ও লচচু মহারাজ-এর কাছে তালিম নেন৷ তাঁর বাবা অচ্ছন্ন মহারাজ ও তাকে একই ভাবে অনুশীলন করান৷ যদিও নৃত্যই তাঁর প্রথম শিল্প শৈলী, কিন্তু ভারতীয় মার্গ সংগীতের ওপরে তাঁর যথেষ্ট দখল ছিল৷
১৯৬৪ সালে তিনি আকাদেমি পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে পদ্মবিভূষণ, ১৯৮৭ সালে লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার পান৷ সংগীত কলা অ্যাওয়ার্ড-সহ বহু সম্মান পেয়েছেন৷
ভারতীয় চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান বিশাল৷ সত্যজিৎ রায় এর ছবি সতরঞ্জ কে খিলাড়ী, হিন্দী ছবি উমরাও জান, দেবদাস-সহ বহু ছবিতে কাজ করেছেন৷ তিনি একাধারে সংগীত, ছবি আঁকার শিল্পীও ছিলেন৷ কোরিওগ্রাফার হিসেবে অনেক ছবিতে কাজ করেছেন৷ কলাশ্রম নামে একটি সংস্থা তৈরি করেন৷ ছবি আঁকা, সংগীত, নৃত্য এখানে শেখানো হয়, যাতে ছাত্রছাত্রীরা বিশেষ তালিম পেতে পারেন৷ ৮৪ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷
বাঙলির নষ্টালজিক কমিক্স কার্টুন বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে-র জনক নারায়ন দেবনাথ চলে গেলেন অনন্তলোকে৷ রেখে গেলেন ৬০ বছরেরও বেশি তাঁর মনন ও রঙীন তুলির অনন্য ও অজস্র কমিক্স কার্টুন৷ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার আনন্দ সাথী নারায়ণ দেবনাথ ৯৭ বছরে প্রয়াত হলেন, মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি সকালে৷
আদি দেশ ওপার বাংলা হলেও তিনি জন্মগ্রহণ করেন এপার বাংলাতেই৷ ছোট থেকেই তার আঁকার দিকে মনোযোগ ছিল৷ স্কুল গন্ডী পার হওয়ার পর তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ ফাইন আর্টসের ছাত্র৷ পারিবারিক ব্যবসা অলংকার শিল্পের৷ পরিবারের ইচ্ছে বসুন তিনি দোকানে৷ অগত্যা আর্ট কলেজ ছাড়তে হল৷ দোকানের আশেপাশে ছেলেরা খেলা করত৷ নিবিষ্ট মনে তাদের খেলা, চলন বলন দেখতেন৷ সঙ্গে সঙ্গে চলতো তার ছবি ফুটিয়ে তোলার কাজ৷ ঐ শুরু হাতের যাদুতে ফুটিয়ে তোলা বাঁটুল, হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে, সুপারিনডেনট আরো কত চরিত্র৷ যা আবালবৃদ্ধবনিতাদের আবিষ্ট করে রেখেছে৷ ভবিষ্যতেও রাখবে৷ ১৯২৫ সালে নারায়ণ দেবনাথ জন্মগ্রহণ করেন৷ পটল চাঁদ দি মাজিশিয়ান, বাহাদুর বেড়াল-এর মত সৃষ্টি হয়েছে তাঁর তুলিতে৷
কমিক্স শিল্পী পদ্ম সম্মান-সহ আকাদেমি, বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত হন৷ এছাড়া ডিলিট সম্মান ও পান তিনি৷ রঙ তুলির যাত্রা ৬২ সালে হলেও (বাঁটুল চরিত্র দিয়ে) তারও আগে তিনি তার অংকন শুরু করেন, কমিক্স-এর৷ টানা ২৫ দিন একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত মঙ্গলবার প্রয়াত হন৷ প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তি শোক বার্তা পাঠান, সাধারণ মানুষের ঢল হাওড়ার শিবপুরে তাঁর বাড়িতে৷ শেষ দেখার জন্য। সন্ধ্যায় পঞ্চ ভূতে বিলীন হয়ে গেলেন বাঙালি আবেগ নারায়ণ দেবনাথ৷ হ্যারি পটার বেশী জনপ্রিয় না বাঁটুল এই তর্ক আগামী দিন আরো উজ্বল করে রাখবে এই কিংবদন্তিকে।



