সুভাষচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। এ বছরে তাঁর ১২৫তম জন্মদিন। তাঁর বাবার নাম জানকীনাথ বসু। মা প্রভাবতী দেবী। তাঁরা তখন থাকতেন কটকে। জানকীনাথবাবু ছিলেন আইনজীবী। কটকে থাকার ফলে ওড়িয়াভাষীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ হয়েছিল। ওই এলাকা ছিল মুসলিম প্রধান। ফলে প্রতিবেশী শিক্ষক, সহপাঠীদের অধিকাংশ ছিল মুসলিম। মুসলিম পরবগুলিতে তাঁরা নিজেরা অংশ নিতেন। কৈশোরেই বহু মুসলিম পরিবারের সঙ্গে মেলামেশার জন্য সুভাষচন্দ্র আজীবন ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন।
পাঁচ বছর বয়সে কটকের ব্যাপ্টিস্ট মিশন পরিচালিত প্রোটেস্টান ইউরোপিয়ান স্কুলে ভর্তি করা হয়। ওই স্কুলে ইউরোপের বহু দেশের ভাষা শেখানো হলেও কোনও ভারতীয় ভাষা শেখানো হতো না। ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তিনি ওই স্কুলে পড়েছিলেন। তারপর কটকের াভেনশন কলেজিয়েট স্কুলে চলে আসেন। তখন তাঁর বয়স ১২ বছর। বাংলা লেখা ও পড়ায় তাঁর তখন একটা অস্বাচ্ছন্দ্য ভাব ছিল।
সুভাষ কলকাতায় এলেন : সুভাষ ১৯১৩ সালে কলকাতায় আসেন। তাঁর বাবার তৈরি ৩০/২ এলগিন রোডের তিন তলা বাড়িতে সুভাষ থাকতে লাগলেন। তারপর ১৯১৫ সালে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। দর্শনে অনার্স নিয়ে।
প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রদের মধ্যে নানান ভাবনাচিন্তার পড়ুয়ারা ছিলেন। অনেকেই গোপনে বিপ্লবী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। পড়াশোনার বাইরেও নানা কিছু করতেন। সুভাষ কলেজে নির্বাচিত ছাত্র কমিটির ক্লাস প্রতিনিধি ছিলেন। বিতর্ক গোষ্ঠীর সেক্রেটারি, পূর্ব বাংলার দুর্ভিক্ষ ত্রাণ কমিটির সেক্রেটারি, নতুন শুরু হওয়া কলেজ পত্রিকার বোর্ডের অন্যতম সদস্য।
১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। ইতিহাসের অধ্যাপক এডওয়ার্ড ফারলে ওটেন ভারতীয় ছাত্রদের সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করতেন। সুভাষ বিষয়টি জেনে সহপাঠী ছাত্রদের নিয়ে অধ্যক্ষের কাছে যান। বলেন, ওটেন যেন ছাত্রদের কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু অধ্যক্ষ কিছুই করেন না। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা পরদিন সাধারণ ধর্মঘট ডাকে। ধর্মঘটী ছাত্রদের উপর প্রিন্সিপাল পাঁচ টাকা করে জরিমানা ধার্য করেন। পরেরদিন ওটেন-এর ইতিহাস ক্লাসে ১২ জন ছাত্রের ১০ জনকে তিনি ক্লাস থেকে বার করে দিলেন। এর পরে সে বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ওটেন আবার এক ছাত্রের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা প্রেসিডেন্সি কলেজের মধ্যেই ওটেন-কে উত্তমমধ্যম দেন। এই ঘটনার পর সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ করে দেয়। ১৯১৬ সালে সুভাষকে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সুভাষ ভর্তি হন স্কটিশচার্চ কলেজে। তারপর দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স পেয়ে তিনি পাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।
বিলেতে সুভাষ : ২২ বছর বয়সি সুভাষ ১৯১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বোম্বে থেকে জাহাজে করে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি আইসিএস পরীক্ষায় বসলেন। ১৯২০ সালের জুলাইয়ে। আইসিএস পাসও করলেন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাঁকে টানছিল। তাই আইসিএস পাস করেও চাকরি নেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল। তিনি চেয়েছিলেন মোটা মাইনের চাকরি না করে দরিদ্র মানুষে সেবা করতে। চাকরি একটা জুটেছিল, সেটাও সুভাষ ছেড়ে দিলেন। ১৯২১ সালের ২২ এপ্রিল। ইম্পিরিয়াল সিভিল সার্ভিস পাস করা কারুর পক্ষে চাকরি ছাড়াও বেশ কাঠখড় পোড়ানোর ব্যাপার ছিল। ১৯২১ সালের ১৬ জুলাই তিনি বিলেত থেকে জাহাজে করে বোম্বাই এসে নামলেন। তখন তাঁর বয়স সাড়ে চব্বিশ বছর। সেদিন বিকেলেই গান্ধির সঙ্গে দেখা করতে ছুটলেন। ওই একই জাহাজে ইউরোপ থেকে ফিরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাত্রাপথে কবি ও দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন।
এরপর সুভাষ চিত্তরঞ্জন দাশের প্রতি আকৃষ্ট হন। চিত্তরঞ্জন ব্যারিস্টার ছিলেন। চিত্তরঞ্জন দাশ খুবই উদার মহাদানী ব্যক্তি ছিলেন। কত সম্পত্তি যে তিনি দেশের সরকারের ব্যবহারের জন্য লিখে দিয়েছেন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। কলকাতা হাইকোর্টের রাজকীয় অঙ্কের টাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সি আর দাশ।
এই সময়ই ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর ইংরেজ সরকার চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুকে গ্রেফতার করে। এই প্রথম সুভাষ জেলে গেলেন। মোট ১১ বার জেলে গেছেন।
১৯২২-এর গোড়ায় গান্ধি বললেন, এবার সরকারকে খাজনা দেওয়া বন্ধ করা হবে। গুজরাটের বাগদৌলি জেলা থেকে শুরু হবে সেই আন্দোলন। কিন্তু ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তপ্রদেশের চৌরাচৌরি গ্রামে বিদ্রোহীরা পুলিশ থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন ২১ জন পুলিশ। এটা দেখেই গান্ধি তৎক্ষণাৎ অসহযোগ আন্দোলনের অবসান ঘোষণা করলেন। ১৯২২ সালের ১০ মার্চ গান্ধজিকে আমেদাবাদের জেলে নিয়ে যাওয়া হল। তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হল।
গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করায় চিত্তরঞ্জন দাশ তার প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, এরপর আইন সভা বয়কট করার কোনও অর্থ হয় না।
জেল থেকে বেরিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে যান। সেপ্টেম্বরের শেষে ভয়ানক বন্যায় সেখানে অবস্থা খারাপ ছিল। এক হাজার কংগ্রেস ভলেন্টিয়ার জোগাড় করে তিনি বন্যা কবলিত জেলাগুলিতে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে ত্রাণকার্য চালান।
১৯২২ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে সভাপতি হন চিত্তরঞ্জন দাশ। সি আর দাশ-কে গান্ধিপন্থীদের অনেকেই বলেন, গান্ধি যেমন চাইছেন, তেমন ভাবে প্রতিষ্ঠানগুলির বয়কটই শ্রেষ্ঠ পথ। সি আর দাশ কংগ্রেসের সভাপতি পদ ছেড়ে দিলেন। এর কিছুদিন পরেই মোতিলাল নেহরু ও চিত্তরঞ্জন দাশ মিলে স্বরাজ্ পার্টি তৈরি করলেন। এইবার কংগ্রেসের মধ্যে দেখা দিল ‘প্রো-চেঞ্জার’ ও ‘নো-চেঞ্জার’-এর দ্বন্দ্ব।
চিত্তরঞ্জন দাশের কথায় সে সময় সুভাষচন্দ্র বসু ‘বাংলার কথা’ নামে একটি পত্রিকা বার করলেন। ইংরেজি পত্রিকাও বেরোল ‘ফরওয়ার্ড’। ১৯২৩ সালের কথা। সে সময় সুভাষকে বাংলার প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদকও করা হল। চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতার মেয়র হলেন। ডেপুটি মেয়র হয়েছিলেন সুরাবর্দি। চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর নিজের ভাবশিষ্য সুভাষচন্দ্র বসুকে কর্পোরেশনের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার করেন। ১৯২৫ সালে ১৬ জুন মাত্র ৫৪ বছর বয়সে চিত্তরঞ্জন দাশ প্রয়াত হন। এদিকে তখন জেলে রাজবন্দিরা অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। বন্দিদের স্ব-স্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠান জেলের মধ্যে পালনের অধিকার আদায়ের দাবিতে ছিল এই অনশন। ১৯২৭ সালে সুভাষকে বাংলা প্রদেশ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করা হল। ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন আসে। এ সাইমন কমিশন বয়কটের দাবিতে দেশ জুড়ে আন্দোলন হয়। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাইমন কমিশন ভারতে পা রাখার সময় সব দল মিলে একত্রে তাঁকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিল। কমিশনের সাত সদস্য শুনলেন ‘গো ব্যাক’ ধ্বনি। যেখানেই তাঁরা গেলেন দেখানো হল কালো পতাকা। ১৯২৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন বসল কলকাতায়। এর আগে যত জায়গায় অধিবেশন হয়েছে তার তুলনায় কলকাতার অধিবেশনে বেশি লোক জড়ো হয়।
১৯২৯ সালে সুভাষ শ্রমিক আন্দোলনে জড়ান। জামশেদপুরে টাটার কারখানায় শ্রমিকদের বিক্ষোভে সুভাষ নেতৃত্ব দিতে ছুটলেন। ১৯২৯ সালের শেষ দিকে সুভাষচন্দ্র বসুকে এআইটিইউসি-র সভাপতি করা হয়। ভারতে প্রথম শ্রমিক সংগঠন হল অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস। ১৯২০ সালের অক্টোবরে এই ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা হয়। এআইটিইউসি মূলত কমিউনিস্টরা তৈরি করলেও এতে কংগ্রেসের নেতারাও ছিলেন। এমনকি সর্বোচ্চ পদেও কংগ্রেসের নেতারা ছিলেন।
১৯৩০ সালের মার্চে গান্ধিজির নেতৃত্বে শুরু হয় লবন আইন অমান্য আন্দোলন। লবন আইন অমান্যের পর শুরু হল ব্রিটিশ পণ্য বয়কট, বিদেশি মদের দোকানে সরকারি শুল্ক বর্জনের পিকেটিং। এই সময়ই মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করলেন। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিনয়-বাদল-দীনেশ কলকাতায় ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। বিনয় বসু ও বাদল গুপ্ত মারাত্মক আহত অবস্থায় ঘটনাস্থলেই মারা যান। দীনেশ গুপ্তর বিচার ও ফাঁসি হয়। সুভাষ বসু তখন জেলে।
রুশ বিপ্লবের পর তখন ১৩ বছর কেটে গেছে। জওহরলাল নেহরু ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়া ঘুরে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের খুব প্রশংসা করছেন। সুভাষ সেখানকার সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের সমর্থক কিন্তু তিনি অন্য দেশের জিনিস নকল করতে চান না। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিদেশ থেকে শেখা যেতে পারে, অনুপ্রেরণা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু অন্ধভাবে অন্য কোনও জাতির অনুসরণ করা উচিত নয়।
লন্ডনের বিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা ১৯২০ সালের পরবর্তী ভারতীয় আন্দোলনের উপর একটি বই লেখার জন্য সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করে। ১৯৩৪ সালের জুন থেকে এই কাজের জন্য সুভাষ ভিয়েনায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন। এখানেই এই কাজে তিনি সহকারী হিসেবে পান এমিলি শেঙ্কেলকে। ১৯৩৫ সালে জানুয়ারি মাসে সুভাষ বসুর লেখা বই ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাগল’ প্রকাশিত হয়। ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রাম বিষয়ে সুভাষচন্দ্রের বিশ্লেষণ ছিল এতে।
১৯৩৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর সুভাষ এমিলি শেঙ্কেলকে বিয়ে করেন। তাঁদের একটি কন্যা সন্তান হয়। নাম অনিতা বসু পাফ।
