তৃতীয় ঢেউ প্রমাণ করে দিল যে করোনার মত গণতান্ত্রিক আর কেই নয়। গণতান্ত্রিক না বলে জনগণতান্ত্রিকও বলা হলে মন্দ হয় না। আসলে রাজনীতির কারবারিরা ‘গণতন্ত্র’ শব্দটা নিয়ে এতবার এতভাবে লোফালুফি করেছে, নিজেদের ইচ্ছেমত খেলেছে যে, শব্দটার আসল মানে-মাত্রা কি সেটাই অবলুপ্ত হতে বসেছিল। করোনা এসে সেই বিলীয়মান লুপ্তপ্রায় অর্থসর্বস্য শব্দটাকেই যেন পুনরুজ্জীবিত করে দিল। সংবিধানসম্মতভাবে গণতন্ত্র অর্থে যদি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গরিব-বড়লোক-স্ত্রী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গ সকলের সমানধিকারি, সমান ক্ষমতা বোঝায় তাহলে করোনাই এ যুগে একমাত্র। রাজনীতিকরা যে গণতন্ত্রের কথা হামেশাই বলে যায়, তা সেই অর্থে এখন অর্থহীন, ধারহীন, মানে মাত্রাহীন মাত্র। ভোটে জেতারা বলে গণতন্ত্রের জয়, হারারা বলে গণতন্ত্রের পরাজয়। তাতে আমজনতার মাথায় ঢোকে না গণতন্ত্র ব্যাপারটা আদপে কী! খায় না মাথায় মাখে, নাকি পায়ে পরে! করোনা এসে সেই চক্ষুকর্ণের বিবাদ মোচন করে জানিয়ে দিল— সেই একমাত্র যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ মানে না। নিজের নিয়মে অতি সন্তর্পণে অথচ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কোন থানা, পুলিশ, মাস্তান, তোলাবাজ দিয়ে রোখা যায় না তাকে। সর্ব ধর্মীয় এবং সর্ব সম্প্রদায়ের প্রতি সে সমান দায়বদ্ধ। তাই সেই একমাত্র জনগণতান্ত্রিক অদৃশ্য শক্তি। লাল চিন থেকে জন্ম শোনা গেলেও শাখা প্রশাখা বিস্তারে করোনা এখন বিশ্ব ত্রাস, তৃতীয় বারের মত। গত ২ বছর এবং চলতি বছরেও দেখা গেছে শীত পড়তেই সে রে রে করে তেড়ে এসে বেশ কিছু প্রাণ খসিয়ে, বহু মানুষকে ভুগিয়ে অস্থায়ী প্রস্থান করে। পরের বার আবার আসে— আসছে বছর আবার হবে। এসব জেনে বুঝেও এবং ডাক্তারবাবুদের অতি সতর্কবার্তা সত্ত্বেও এ বঙ্গে পুজো হয়, বড়দিন হয়, মেলা হয়, খেলা হয়, জন্মদিন হয়— সর্বোপরি ভোট হয়, তার প্রচার চলে দুর্দান্ত বেগে, মিটিং হয়, মিছিল হয়। এসব হয় গণতন্ত্রের কথা বলেই। কিন্তু হয়টা যা তা নিছকই সুবিধাবাদ সন্তুষ্টিবাদ, পোষণবাদ সর্বস্ব লোক দেখানোপনা। হইহই করে লোক জড়ো করা না গেলে আর কি হলো। গণতন্ত্র মানই তো জনমত, জনগণ, জনজাগরণ তথা উন্নয়ন। কিন্তু সমারোহে যে আর এক গণতান্ত্রিক মারণ ভাইরাসের রমরমা ঘটতে সুবিধা, তা বুঝেও না বোঝাটাই যখন রাজনীতি তখন কার কি বলার আছে। জানুয়ারি পড়তেই যখন লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা বঙ্গদেশে দৈনিক ১৫-১৬ হাজার এবং দেশে লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছালো তখন বাবুদের রাজনৈতিক টনক নড়ে উঠলো। ব্যাস চলচ্চিত্র, মেলা শুরু হয়েও বন্ধ হলো। গঙ্গাসাগর মেলা আদালত গড়ালো, বইমেলা অনিশ্চয়তায় ঢাকলো— খেলা তো এটাই। যে খেলা হচ্ছে এবং হবে আরও। অতি উর্বর মস্তিষ্কের প্রভাবে এমতাবস্থায় আরও চারটি বিধানসভা ভোট ডাকা হয়েছে। জয়তু কমিশন। এক কলকাতার ভোটের পরবর্তী করোনা সংক্রমণ দেখেও তাদের শিক্ষা হল না। কিন্তু এটা ঠিক এমন মারণ রোগ রুখতে টিকা দেওয়া-সহ ব্যবস্থা হয়েছি বইকি। পাঠশালা বন্ধ করে পানশালা খোলা রাখার ঘোষণা হয়েছে। লোকাল ট্রেন ৭টা পর্যন্ত ঘোষণা করে প্রথম দিনেই যাত্রীবিক্ষোভে সেটা বদলে রাত ১০টা করা হয়েছে। অর্থাৎ আগাম জানা সত্ত্বেও হুঁশ বা ফেরাদের এমনই অবস্থা যে সব কিছুই রোজ রোজ ঘেঁটে ঘোল হয়ে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলিতে অতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি লেখা অনেকেরই চোখে পড়েছে। সেটির জনপ্রিয়তা প্রায় ‘কাঁচা বাদাম’ গানের মতই হু হু করে ছড়াচ্ছে। আমাদের পাঠককুলের জ্ঞাতার্থে লেখাটি যেমন রয়েছে তেমন মুদ্রিত করা হল—
লোকাল ট্রেন এখন 50% যাত্রী নিয়ে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত চলবে, তাই একজন সুনাগরিক হিসাবে এই কর্তব্যগুলো অবশ্যই পালন করবেন।
১. প্রথমেই ট্রেনে উঠে গুণে নেবেন মোট সিট কটা রয়েছে। ধরে নিন 30 টা সিট রয়েছে এবং প্রতিটা সিটে তিনজন করে বসতে পারে। তাহলে মোট যাত্রী হবে 90 জন।
২. এবার ক্যালকুলেটর বের করে নব্বইয়ের 50% হিসাব করুন। যদি পার্সেন্টেজের অংক ভুলে গিয়ে থাকেন, তাহলে পাতি ২ দিয়ে ভাগ করে দেবেন।
৩. এবার যদি দেখেন আপনি অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে গেছেন তাহলে তৎক্ষণাৎ ট্রেন থেকে নেমে পড়বেন, এবং পরবর্তী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করবেন।
৪. মাথায় হেলমেট পরে ট্রেনে উঠতে ভুলবেন না কারণ এত হিসাব কষতে গিয়ে যদি ট্রেন ছেড়ে দেয়, তাহলে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামতে হতে পারে।
৫. যদি দেখেন ট্রেন লেট করছে এবং সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তাহলে ড্রাইভার এর কাছে গিয়ে অনুনয়ের সুরে বলবেন, “কাকু একটু জোরে চালান”…
৬. মাথায় রাখবেন সাতটার পরে ভাইরাসগুলো দল বেঁধে ঘুরতে বেরোয়। তাই সারাদিন লোকাল ট্রেনে চাপলে ক্ষতি নেই, কিন্তু ঠিক ৬টা বেজে 59 মিনিটের পর ট্রেনে থাকলেই আপনি খরচার খাতায়।
তাই অবশ্যই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আপনি সুস্থ না থাকলে পরের বছর পার্কস্ট্রিটে লাইটিং দেখতে যাবে কে? অস্বাভাবিক ভিড়ের মধ্যে জমায়েত করে পরের বছরও যদি চতুর্থ ঢেউকে ডেকে এনে, খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পেটে চিমটি কাটতে না পারেন; তাহলে আপনি কিছুতেই সুনাগরিক হতে পারবেন না।
