রান চাই, সোজা ব্যাটেই মার বা উল্টো করেই মার, বল বাউন্ডারি টপকালে তালিয়া

‘সাম্প্রদায়িক’ গাল দিয়ে সম্প্রদায়গত ভোটের হিসেব করতে ডান-বাম ওপর-নীচে সামনে-পিছনে সব রাজনৈতিক দলেরই এক কৌশল। তোষণনীতি। এই নীতির সবচেয়ে বড় দাওয়াতপ্রাপ্তরা হল এদেশের সংখ্যালঘু, আরও সোজা কথায় বললে মুসলমানরা। অঙ্কের হিসেব। সংখ্যাগুরু ভোট যা হয় হলো, কিন্তু সংখ্যালঘুদের ভোটটা ছলে-বলে কবজা করতে পারলেই পাল্লা ভারী হয়ে কেল্লাফতে। এই হিসেব কংগ্রেস, বামপন্থী, তৃণমূল সবাই জানে, সবাই বোঝে, সবাই সময়মতো করেও। আবার মুসলমান ভোট পাব না ধরে নিয়ে বিজেপিও এই অঙ্ক গুলিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সেটাও ঠিক। রাজনীতি করতে গেলে, ক্ষমতার মসনদে বসতে গেলে এমন হিসেব না করে পা ফেললে চলবে কেন? এক্ষেত্রে নীতি-আদর্শ ইত্যাদি প্রভৃতি খাটে না। ওয়ান ডে ক্রিকেটের মত। রান চাই, সোজা ব্যাটেই মার বা উল্টো করেই মার। বল বাউন্ডারি টপকালে তালিয়া। অস্বীকার করার উপায় নেই, সংখ্যালঘু মুসলমানরা এখন বৃহদাংশেই এখনও মৌলবীতন্ত্রে আকৃষ্ট। মসজিদ থেকে যা বলা হবে সেটাই বেদবাক্য তাদের কাছে, এটাও ভুললে চলবে না, যতই শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব ইত্যাদি প্রচার করা হোক ভারতীয় সংবিধান তথা আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখানোতেই তাদের যেন আত্মগরিমা। এমন কথা বললে এক্ষুনি কিছু মানুষ আছে যারা রে রে করে এসে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদী ইত্যাদি গাল পাড়তে বসে যাবেন বটে, কিন্তু রাজাবাজার আর খিদিরপুর-গার্ডেনরিচের নিয়মকানুন আদবকায়দাতে বিস্তর ফারাক আছে সেটা সকলেই জানে। দেশের ক্রাইম রেকর্ড ঘাটলে এই মানুষগুলো যে অন্যান্য সম্প্রদায়কে টেক্কা দিচ্ছে তাও অজানা নয়। বলছি না সবাই এমন, কিন্তু অধিকাংশই এমনটা। তাই রাজনীতির কারবারিরা বরাবর এই সাম্প্রদায়িক তাসটি কখনও প্রকাশ্যে, কখনও সুকৌশলে খেলে চলেছেন যে যার সংকীর্ণ দলবাজির স্বার্থে, ক্ষমতায় বসার তাগিদে। অধুনা বঙ্গদেশে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে তাই তোষণনীতি নির্ভর হয়েছে। মোয়াজ্জেম ভাতা ইত্যাদি চালু করেছে। তাতে অ-মুসলিম করদাতা বিগড়ে গেলেও তোয়াক্কা করেনি। বেশি বিগড়ে গেলে পুরুতঠাকুর ভাতা দিয়ে আর এক দফা তোষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনের খিড়কি দোর দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রদায় ঢুকে পড়েছে। এই তৃণমূলের তোষণনীতির পাল্টা বাম-কংগ্রেস জোটও চাইছে মুসলিম ভোট কবজা করতে। হুগলির ফুরফুর শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে সখ্যতা বাড়িয়ে সেই চেষ্টা শুরু হল। পুজোপাঠ, ধর্মকর্ম না মান কমিউনিস্টরা ইদানীং বলছেন, পীরজাদা মুসলমানদের কথা বলেন না, সব ধর্মের দরিদ্র দলিতদের কথাই বলেন। তাই তাকে সঙ্গে নিলে ক্ষতি নাই। এদিকে হায়দরাবাদের দল মিম-এর নেতা আসাউদ্দিন ওয়েইসি কদিন আগেই ফুরফুরা ঘুরে বৈঠক করে গেছেন পীরজাদার সঙ্গে। তিনি সটাং বলেছেন, বাংলায় পীরজাদা যা বলবেন, সেটাই মিম মেনে চলবে। কিন্তু মিম সম্পর্কে আবার বাম-কংগ্রেসের ভিন্ন মত রয়েছে। এদের ততটা উদার সবার জন্য কাজ করতে চাওয়া দল মনে করে না তারা। তাহলে কি দাঁড়ালো হিসেবটা? মুসলমান ভোট পেতে পীরজাদাকে চাই, কিন্তু মিম নয়। আবার মিম নয় পীরজাদাকেই। বোঝো কাণ্ড, লণ্ডভণ্ড। আবার কিছু লোকের বক্তব্য, মিম হল বিজেপির তৈরি মুসলমানদের সংগঠন। তারা মুখে যাই বলুক মুসলমান ভোট কেটে দিয়ে বিজেপির সুবিধা করতেই মাঠে নামে। মিম যদিও বিহার ভোটের উদাহরণ টেনে এই দাবি খণ্ডন করতে চেয়েছে। তাও সন্দেহ মোচন হয়নি। মূলত এই কারণেই বাম-কংগ্রেস ‘মিম’ অ্যালার্জি রয়েছে। এদিকে পীরজাদা ২১ জানুয়ারি একটি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করবেন বলে জানিয়েছেন। তাকেও সমর্থন জানিয়েছে মিম। ফলে বামপন্থী এবং কংগ্রেস বিষয়টি দেখে সখ্যতার বার্তা দিয়ে এক পা এগোলেও দু-পা পিছিয়ে যাচ্ছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দশা। মিম এরাজ্যে সরকারি অথবা পীরজাদাকে ধরে ঢুকে পড়লে মুসলমান ভোটে যে কাটাকাটি হবেই তার গন্ধ পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও। ফলে আসন্ন বিধানসভা ভোটের মুখে এসে সংখ্যালঘু তোষণের ফলটা ঘরে তুলতে গিয়ে হোঁচট খেতে না হয় সে নিয়ে তাদের দলেও চাপ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এমন সব সাম্প্রদায়িক ভোট রঙ ও কুশীলবদের দেখে উৎফুল্ল বিজেপি। মুসলমান ভোট শত বিভক্ত হলে তাদের যে পোয়া বারো— এটা তারা ভালোই জানে। তাছাড়া ১০ বছর রাজত্বের পর শাসকদলের বিরুদ্ধে খুব স্বাভাবিক ‘অ্যান্টি ইনকমবেন্সি’ তৈরি হয়েছে— সেটাও তাদের জানা। তৃণমূলের ঘর ভাঙার যা একটা বড় কারণ। সততার স্বচ্ছতা যেমন থাকছে না, তেমনি বিজেপি ‘ওয়াশিং মেশিনে’ পড়ে ম্যাথু স্যামুয়েলের ফুটেজে ধরা পড়া কেউ কেউ ক্লিন হয়ে যাচ্ছে, সেটাও ঘটনা। ওদিকে যুব তৃণমূলের নেতা উদ্যোগপতি বিনয় মিশ্রর নাম জড়িয়েছে কয়লা-গরু-বালি পাচারের সঙ্গে। তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে দুবাইয়ে রয়েছেন বর্তমানে। সবটা মিলিয়ে ভোট পূর্ববর্তী বাংলা জুড়ে একটা বিরাট রাজনৈতিক মেগা সিরিয়াল চলতে শুরু করেছে। কোন চরিত্র আজ সৎ তো কাল অসৎ হবে সেটা কেউই আগাম বলতে পারছে না। তাই এবার ভোটাররা খুবই কনফিউজড। সাড়ে তিন দশকের বামজমানা থেকে মুক্তি পেতে যাদের আনা হল তারা দশ বছরেই যা দেখালো, তাতে আক্ষেপটা স্বাভাবিক। অগত্যা— ভোট দেবেন কোন খানে — এবার নোটাতে বেশ কিছু সমাজ সচেতন, রাজনৈতিক বিচক্ষণ ব্যক্তির ভোট পড়বে না তো??

Leave a comment