সাঁওতাল বিদ্রোহ ১৮

শিবানন্দ পাল

১৯ আগস্ট, ১৮৫৫ টি সি লোচ স্পেশাল কমিশনার বীরভূমের জেলাশাসককে একটি চিঠিতে সিপাইদের অবস্থানের জন্য অবিলম্বে ৫০০টি কুটির নির্মাণের কথা বলেছেন। জানিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার বার্ডয়ের ইচ্ছা সিউরির জেলখানার দক্ষিণ প্রান্তে ঈদগাহের বাঁ দিকে বামিদাপুরের রাস্তার ধারে জায়গাটি বিবেচনা করার জন্য। কারণ এর দক্ষিণে ভালো প্যারেড গ্রাউন্ড আছে। জমিদারদের ডেকে এই কাজটি করার জন্য তিনি নির্দেশ দিতে বলেছেন, বলেছেন কাজের জন্য তাঁদের পাওনা নিশ্চয়ই মিটিয়ে দেওয়া হবে। তবে কাজে যেন দেরি করা না হয়। কাজে অবহেলা হলে উপযুক্ত শাস্তি দেবার কথাও তিনি জেলাশাসককে বলে দিয়েছেন। এছাড়া সাজানোগোছানর কাজে তিনি জেলখানার কয়েদী এবং স্থানীয় সরকারি অফিসারদের সাহায্য নিতে বলেছেন। বীরভূমের জেলাশাসকের ওপর এই সমস্ত কাজের ব্যয়ভার বহন করার দায়িত্ব ন্যস্ত করে স্পেশাল কমিশনার টি সি লোচ সরকারকে সমস্ত বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন।
১৮ আগস্ট, ১৮৫৫ ভাগলপুরের স্পেশাল কমিশনার এ সি বিডওয়েলকে ভাগলপুরের কমান্ডিং অফিসার আর ডব্লিউ ম্যাকফার্সন যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে জানা যাচ্ছে সরকারের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সৈন্যবাহিনীর জন্য যে রসদ সংগ্রহ করা হয়েছিল তার দাম নিম্নরূপ। আটা টাকায় ১৫ সের, ঘি টাকায় দু-সের, ডাল টাকায় ১০ সের এবং নুন টাকায় ৮ সের।
২১ আগস্ট, ১৮৫৫ বাহিনীর কমান্ডিং ডিটাচমেনট অফিসার লেফটেন্যান্ট এইচ ডব্লিউ টি গর্ডন মুঙ্গেরের জেলা শাসককে জানিয়েছেন, বাহিনী সমেত তিনি এসে পৌঁছে গিয়েছেন। তাঁর আসার কথা ৭ আগস্ট তাঁকে অগ্রিম জানানো হয়েছিল, কিন্তু জেলাশাসক কি ব্যবস্থা করেছেন দ্রুত জানতে চেয়েছেন লেফটেন্যান্ট। তিনি আরও জানিয়েছেন তাঁর বাহিনীর ছ’জন সদস্য জ্বরে ও আমাশয় রোগে আক্রান্ত। এদের যদি তাঁবুতে থাকতে হয় তাহলে সংক্রমনের ফলে বাহিনীর আরও অনেকে অসুস্থ হবে এরকম আশঙ্কা রয়েছে। ভাগলপুরের কমিশনার তাঁবু ও গোলাবারুদ বহন করবার জন্য তাঁকে যে পাঁচটি হাতী দিয়েছিলেন সেগুলি ফেরত পাঠানো হচ্ছে ভাগলপুরে। কারণ সেগুলি অন্যত্র পাঠাতে হবে। সেজন্য তিনি জেলাশাসককে তিন চারটে হাতী যোগাড় করে দিতে অনুরোধ করেছেন। তিনি তাঁর বাহিনীর একটি তালিকা চিঠির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। ৪২ নং ইনফ্যান্ট্রি। লেফটেন্যান্ট ১, সুবেদার ১, জমাদার ১, হাবিলদার ৬, নায়েক ৬, বিউগলবাদক ২, সিপাই ৯৪, লস্কর ১, এবং ভিস্তি ১ জন। হিল রেঞ্জার্সদের তালিকা- লেফটেন্যান্ট ১, সুবেদার ১, জমাদার ১, হাবিলদার ৩, নায়েক ৫, ডরামবাদক ২, সিপাই ৯৭, লস্কর ১, ভিস্তি ১ এবং ডাক্তার ১ জন।
২৩ আগস্ট, ১৮৫৫ বর্ধমান বিভাগের কমিশনারের অফিস থেকে অফিসিয়েটিং কমিশনার জে এম এলিয়েট বীরভূমের অফিসসিয়েটিং জেলাশাসককে লিখেছেন ছ’জন ঘোড়সওয়ারের বেতন পাঠিয়ে দিতে। ঘোড়সওয়ারদের নামগুলি হল- ১। চেল আলি খান, ২। মীর মুজাফর খান, ৩। ইমামজুমা খান, ৪। আশুক মীর খান, ৫। মীর আহুর আলি এবং ৬। শেখ তোফাজ্জ্বল হোসেন।
২৮ আগস্ট, ১৮৫৫ বর্ধমান বিভাগের কমিশনারের অফিস থেকে অফিসিয়েটিং কমিশনার জে এম এলিয়েট বীরভূমের অফিসিয়েটিং জেলাশাসককে যে চিঠি লিখেছিলেন, তা থেকে জানা যায়- সিউরিতে অবস্থানরত বাহিনীর জন্য রসদ সংগ্রহে সমস্যা হয়েছে। সরকারের স্থানীয় সরবরাহকারী মুদিরা বাহিনীকে খাদ্যকণা সরবরাহ করেনি। সেনাবাহিনীর জন্য রসদ কাটোয়া থেকে সংগ্রহ করে সিউরি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মুর্শিদাবাদের কালেক্টর জামুয়া-কান্দী থেকে রসদ সংগ্রহ করেছেন। সিউরিতে আটার অভাব দেখা দিয়েছে। সেখানকার গরিব লোক এবং আশ্রয় নেওয়া বহু উদ্বাস্তু মানুষ সমস্যায় রয়েছেন। সেখানে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে।
৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৫ বীরভূমের জেলাশাসকের বিশেষ কার্যে নিযুক্ত আধিকারিক জে আর ওয়েনস রানিগঞ্জ থেকে বীরভূমের জেলাশাসককে চিঠিতে লিখেছেন, সাঁওতালদের উদ্দেশ্যে সরকারের ঘোষণাপত্র এবং সেই মর্মে মুচলেকা ও সার্টিফিকেটের কপি বেশী বেশী করে বিলি করতে জোর দেওয়া হয়েছে। জনগণের দৃষ্টি ঘোরাবার প্রয়োজনে এটা গুরুত্বপূর্ণ বলে সরকার মনে করছে। সেজন্য লিথোগ্রাফ মেশিনে এগুলি দ্রুত ছাপার আয়োজন ও বণ্টন চলছে। রানিগঞ্জে জি টি রোডের ধারে বাহিনী রাখার ব্যবস্থা করেই তাঁর সিউরি ফেরার ইচ্ছা। জানিয়েছেন সিউরি সংলগ্ন রাজবাঁধ পল্লীতে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা একত্রিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মেজর নেমবার্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেমবার্ড ব্রিগেডিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন, সুতরাং সাঁওতালদের বিরুদ্ধে তিনি সৈন্যচালনা করতে পারবেন। অবশ্য সাঁওতালরা যদি আত্মসমর্পণ করতে আসে তাহলে অন্য কথা। অবস্থা অনুযায়ী আপনি ব্যবস্থা নেবেন, সৈন্যবাহিনীকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ব্যস্ত করার মানে হয় না। আপনাকে নেমবার্ডের সাথে যোগাযোগ করতে বলছি। তিনি আরও বলেছেন, মহম্মদবাজারে বরকন্দাজের সংখ্যা অপ্রতুল না হলে এক কোম্পানি সৈন্য রাখা যেতে পারে, যদি অবশ্য জায়গাটা স্বাস্থ্যকর হয়, আর যদি মনে হয় সাঁওতালরা হটাৎ আক্রমণ করতে পারে। বলেছেন, সীতাশালের হরমা মালি সম্পর্কে বিস্তারিত খবর দেবেন, আমি শুনেছি সে মিস্টার লচ অথবা আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। তারপর তাকে যখন অন্যান্য সাঁওতাল প্রধানকে নিয়ে আসার জন্য সিউরি পাঠানো হয়, বিদ্রোহীরা বিশ্বাসঘাতক বলে আক্রমণ করে, সে কোন রকমে পালিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু তাঁর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। এটা খুব খারাপ উদাহরণ। লিথোগ্রাফ করা আত্মসমর্পণের ঘোষণাপত্র আমাদের হাতে এখনও আসেনি।
১০ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৫। বেঙ্গল সরকারের সচিব ডব্লিউ গ্রে সাহেব বীরভূমের জেলাশাসক আর জে রিচার্ডসনকে বাহবা জানিয়ে লিখেছেন, সাঁওতাল অধিবাসীদের গতিবিধি সংক্রান্ত আপনার ৬ তারিখের রিপোর্টটি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের খুব ভালো লেগেছে। এইভাবেই আপনি পরবর্তী খবরগুলো পাঠাবেন।
১০ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৫। বি প্যারট ক্যাপ্টেন মেজর অফ ব্রিগেড রানীগঞ্জ ক্যাম্প অফিস থেকে সিউরিতে অবস্থানরত মেজর নেমবার্ডকে লিখেছেন- সিউরি থেকে জেলাশাসক আর আই রিচার্ডসনের বার্তা পেয়ে আপনাকে লিখছি। মহম্মদবাজারের চারপাশে সশস্ত্র সাঁওতালরা সমবেত হয়েছে। আশঙ্কা তারা যে কোন মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে। ব্রিগেডিয়ারের নির্দেশ পেয়ে আপনাকে বলছি, আপনি যদি মনে করেন মহম্মদবাজার রক্ষার জন্য সার্জেন্ট গিলেনের বাহিনী যথেষ্ট নয়, তাহলে আপনার সৈন্য নিয়ে আপনি তাকে সহায়তা করবেন। ব্রিগেডিয়ার সাহেবের আরও নির্দেশ, যদি সিউরির আশেপাশে সাঁওতালরা অস্ত্র নিয়ে জমায়েত হয়, জনসাধারণকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে বা গ্রাম লুট করতে শুরু করে, সঙ্গে সঙ্গে আপনি তাদের আক্রমণ করবেন এবং ছত্রভঙ্গ করে দেবেন। তবে সৈন্যদের কাজ যে মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে আনবেন। (সাঁওতাল বিদ্রোহের রোজনামচা- তারাপদ রায়, দে’জ পাবলিশিং, কোলকাতা, ২০০৬, পৃষ্ঠা ৪০-৪৯)।
ওদিকে সাঁওতালরা তখন যুদ্ধ সাজে ব্যস্ত। কবি লোকনাথ দত্ত তাঁর বনবীর-গাথা কাব্যের ত্রয়োদশ পর্বে সাঁওতালদের যুদ্ধ সাজের একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন-
‘মাজীহননে’র ঘরে, প্রৌঢ়েরা মন্ত্রণা করে,
আসন্ন সঙ্কটোদ্ধারে কি আছে সম্বল;
যুবারা আখেড়া’ পরে, মল্ল-ক্রীড়া-অবসরে,
সঞ্চয় করিছে দেহে সংগ্রামের বল;
‘যোগী-মাজী’ পরামর্শে, পল্লী-কুমারেরা হর্ষে,
গড়িতেছে তীর কাঁড়, মহাকুতুহল;
শূকরের কুঁচি দিয়া, পশুলোম বিনাইয়া,
রচিছে ধনুর গুণ কুমারীর দল;
পল্লীর কামার-শালে, আসে যুবা দলে দলে,
গড়ায় ঐষিক-মুখ, বল্লমের ফলা;
গড়ায় ভোঁজালি ছোরা, পরশু, তোমর, খাঁড়া,
কেহ বা ফরমাইশ দেয় বন্দুকের নলা।
সাঁওতালের গৃহ-তাঁত, চলিতেছে দিন-রাত,
বুনিছে সুতার বস্ত্র, পশমী কম্বল;
গৃহিণী বানায় মিঠা, নিমকী ঠেকুয়া-পিঠা,
মোরব্বা, আচার, চাটনী পথের সম্বল;
মৃগমাংস শুষ্ক করি’, রাখিল হাঁড়িতে ভরি’,
মহুয়া-কিসমিসে শত থলিয়া পূরিল;
খলে কুটি শক্তু চিঁড়ে, চটে বাঁধি’ খাঁড় গুড়,
সাঁওতাল রমণী-দল ভাণ্ডার ভরিল;
প্রবীণ সাঁওতাল বীর , শিকারে নির্ভীক ধীর,
লইয়া যুবক-প্রৌঢ় দঙ্গল বাঁধিল;
আসন্ন বিপদ তরে, পল্লীর সজ্জিত ক’রে,
দেবাদেশ প্রতীক্ষায় উৎকীর্ণ রহিল!’
(সাঁওতাল কাহিনী বনবীর গাথা—লোকনাথ দত্ত, সম্পা। অরুণ চৌধুরী, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ১৬৪)। (চলবে)

Leave a comment