সৌমিত্রর শেষ ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি উপাসনা এখন রক্সি স্টুডিওস্-লরিয়েল-ভোগ ইন্ডিয়ার মডেল

মামন জাফরান

ই মেল : upasanaghorui44927@gmail.com
হাইট : ৫’৫’’
ওজন : ৫৬ কেজি
স্কিন : ফেয়ার
চোখ : ডার্ক ব্রাউন
চুল : ব্রাউন
বেলি : ২৮
হিপ : ৩৪
কাপ : ৩৪
বয়স : ২০


দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজের বাসিন্দা বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত বাণীব্রত ঘড়ুই এবং ইংরাজি শিক্ষিকা চন্দনা দেবীর একমাত্র মেয়ে উপাসনা দক্ষিণ কলকাতার আশুতোষ কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি তার এখন প্রায় দম ফেলার সময় নেই। মাসে ১০ দিন কলকাতা তো ২০ দিন মুম্বাই-গোয়া-হায়দরাবাদ। বাঙালি মডেল কন্যাদের মধ্যে অন্যতম উপাসনা এই মুহূর্তে জাতীয় স্তরে মডেল হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। একা একাই হিল্লি-দিল্লি করে বেড়াচ্ছে।
এত সাহস আর গোঁ পাও কী করে? উপাসনার উত্তর, স্বামী বিবেকানন্দকে মানি, বিশ্বাস করি। ওটাই জোর। যা দেখব বিশ্বাস করবো, যা দেখব না মেনে নেব না। তাতে কি কি বলল, ভাবলো কিস্যু যায় আসে না। আমি বোল্ড শ্যুট করি না। তাই বলছি এই কথা।
২৬তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সাজগোজ চলছে নন্দনে। সেই কর্মব্যস্ততার দিকে তাকিয়ে উপাসনা বলল, বাংলায় আমার তেমন কদর কই! অথচ মুম্বাই-গোয়া-হায়দরাবাদে মডেলিং দুনিয়ায় যে সম্মান পাই, সত্যি তা অভাবনীয়। মডেলিং শুধু কেন, ছবির কাজের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অফার এসেছে। মুম্বাইতেই প্রযোজক অজয় পাণ্ডে তাঁর ছবি ‘গোল্ডেন িব্রকস’-এর জন্য কনট্যাক্ট সই করিয়েছেন, দেড় লক্ষ টাকা অ্যাডভান্সও দিয়েছেন। টালিগঞ্জের সিনেমা পাড়ায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত শেষ ছবি ফির দেখাতে সেকেন্ড লিড করেছে ‘উপাসনা’। পরিচালক শ্যামল বসু। একই পরিচালকের ওয়েব মুভি ‘বৃত্ত’-তে লিড রোল, সৃজা-র চরিত্র করেছে উপাসনা। তাছাড়াও একই পরিচালকের ওয়েব সিরিজের ছবি ‘অ্যানাদার হেট স্টোরি’ শুটিং শুরু হয়েছে নর্থ বেঙ্গলে। তিনটি এপিসোডের এই কাজটিতে প্রতিটিতে সাতটি করে সিরিজ রয়েছে।
তাছাড়া স্টার জলসার সিরিয়াল ফাগুন বউ-তেও কাজ করেছে। সেদিন ফিচার ফিল্মটার ডাবিং সেরে হন্তদন্ত হয়ে এলো এই মডেল-অ্যাকট্রেস। দারুণ ফিগার, নিয়মিত জিম করার পাশাপাশি সালসা ডান্স প্র্যাকটিস করে নিজেকে ফিট রাখে উপাসনা। বললাম, তোমায় তো এতদিন মডেল বলেই জানতাম, কিন্তু এখন তো দেখছি রীতিমতো অভিনেত্রী হয়ে গেলে। মডেলিং কি তাহলে চাপা পড়ে গেল? উপাসনা হেসে বলল, তা কেন, আমি তো আগে মডেল। তারপর বিভিন্ন অফার-পরিচয় ইত্যাদি এবং যোগাযোগ করে অভিনয়ের জগতে। এটা কিন্তু এত সহজ ভাববেন না। লড়াইটা কম করতে হয়নি। সেই ছোটবেলা থেকে। মডেলিং-এর শুরু থেকেই তো বাধার পর বাধা। চার বছর আগে ২০১৬-তে মিনু শাড়ি, লাক্স সাবান, এইচ কে দত্ত জুয়েলার্স-এর ৬ মাসের জন্য ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হই। তখন আমার সবে ১৫ বছর বয়স। সেই সময় থেকেই দেখছি কিছু পাড়াপড়শি, কিছু আত্মীয় পিছনে লেগে গেছেন। মা-কে বলতো, স্কুল-এর চাকরি ছেড়ে মেয়েকে সামলাও। একমাত্র সন্তান গোল্লায় যাচ্ছ, মডেলিং আবার কোনো ভদ্রলোকের কাজ হলো। যতসব বাজ লাইন। মেয়েটা নষ্ট হয়ে যাবে সাবধান হও। কিন্তু মা সেসব কথা মুখ বুজে সহ্য করে গেছে। আমার মা-রও একসময় ইচ্ছে ছিল মডেলিং-এ আসার, অভিনয়ে আসার। কিন্তু বাপের বাড়ির ঘোর আপত্তিতে কিছুই হয়নি। আমার মনের ছোটবেলা থেকে এই দিকে আগ্রহ ছিল, হয়তো মা-র থেকেই পাওয়া। তাই এবং বাবা দুজনেই আমায় সবসময় সাপোর্ট করেছে। আর একজন সে আমার বান্ধবী অনুসূয়া দাস। ওদের জন্যই আজ কলকাতা ছেড়ে মফস্বলের একটা মেয়ে একা মুম্বাই-গোয়া যাচ্ছি-আসছি। এই মুহূর্তে আমি মুম্বাইয়ের রক্সি স্টুডিওস্ (ইন্টারন্যাশনাল)-এর ব্র্যান্ড মডেল, লরিয়েল-এবং ভোগ ইন্ডিয়ার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার। বজবজের সেই ভেতো মধ্যবিত্ত বাঙালি মেয়েটাকে এখন অনেকেই চেনে। এই জার্নিটা শুরু করি ২০১৮ থেকে। সেই বছর মা মা আর্থ, অঞ্জলি জুয়েলার্স-এর কাজ করেছি।
২০১৯টা যদিও খুব বাজে গেছে। একটা শ্যুট সেরে শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হলো। আমার মুখের বাঁ দিকে গালটা প্রায় ঘষটে বেরিয়ে গেল, চোয়ালেও আঘাত পেলাম। তাতে ভেবেছিলাম যে কেরিয়ারটাই বোধহয় শেষ হয়ে গেল। মুখটাই ক্ষতবিক্ষত, মডেলিং-এ থাকব কি করে। খুব ভেঙে পড়েছিলাম। তারপর লড়াই করেই টিকে থাকতে হবে— এমন একটা জোর মনে মনেই হাজির হলো। বেশ মনে আছে ১৫ এপ্রিল দুর্ঘটনা হয়েছিল। তার কদিন পরেই সিএমআরআই-এ গিয়ে ডা. দীপঙ্কর দে-কে দেখলাম। প্লাস্টিক সার্জারি হল। মুখটা আবার যেমন ছিল তেমন অবস্থায় ফিরিয়ে আনলাম। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ মাস চলে গেল ট্রিটমেন্ট-বিশ্রামে। তারপর আবার কাজ শুরু করে দিলাম।


আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, ২০১৮-তে মিস কলকাতা শপারস্টপ এং মিস ডিভা কমপিটিশনে মিস ওয়েস্ট বেঙ্গল খেতাব জিতেছি। এগুলো আমার জীবনে বিরাট পাওনা। এর পরে যারা আমায় এবং আমার মা-কে একদিন অনেক আজে বাজে কথা বলত তাদের মুখটা শুকিয়ে গেছে। আর বলে না। এই প্রতিশোধটা নিয়ে আমি বাবা-মাকেই সম্মানিত করতে পেরেছি এটা আমার স্যাটিশফিকশন। আপনিই বলুন, মডেলিং তো ছিলই অভিনয়টাও আমার পরিবারে ছিল। আমার জেঠু সুব্রত ঘড়ুই টালিগঞ্জের নামী সিনেমাটোগ্রাফার। বাবারা নাটক, যাত্রা ইত্যাদিতে অভিনয় করত। মা সাহিত্যের ছাত্রী, আমার মধ্যে তো এই সবের প্রভাব থাকবেই। উপরন্তু পড়াশোনায় যে খুব বাজে ছিলাম, বা এখনও ফাঁকিবাজ তা মোটেই নয়। বজবজ সুভাষ গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক, যোগেশ্বরী কলেজ থেকে ১১-১২ ক্লাস পাশ করেছি। রেজাল্ট কোনটারই ফেলনা নয়। নম্বর-এর ভারেই আশুতোষ কলেজে ইংরাজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হতে দরখাস্ত করি। প্রথম তালিকায় নামও ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত ভর্তি হই পাশ কোর্সে। এবার ফাইনাল ইয়ার। পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। কাজ এবং পড়াশোনার জন্য আমরা গল্ফগ্রিনে ফ্ল্যাট কিনেছি। সেখানে আমি বাবার সঙ্গে থাকি। মা থাকে বজবজের বাড়িতে। একদিকে কাজের চাপ বাড়ছে, পরপর ছবির অফার আসছে, পড়াশোনাটাও চালাতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রতিটা দিন যদি আরও ৩-৪ ঘণ্টা করে বাড়ানো যেত, ২৪-এর জায়গায় ২৭-২৮ ঘণ্টা হতো তাহলে ভাল হতো। কিছু নতুন ভাবারও সময় জোটে না। সল্টলেকের আইআইডিআই থেকে সালসা ডান্স শিখেছি। বডি ফিট রাখতে ওটা দারুণ। বাড়িতেই প্র্যাক্টিস করি। ওই নাচের সময়টাই নিজস্ব বলতে পারেন। আর সময় কই!

Leave a comment