সাপে কেটেছে মাথায়, তাগা বাঁধবি কোথায়


জানুয়ারির ৮ থেকে ১৫ নন্দন-সহ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রেক্ষাগৃহে এবার ২৬তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হচ্ছে। ছবির এই মহামেলায় প্রতিবার যেমন কলকাতা তথা বঙ্গবাসীর উৎসাহ দেখা যায় তা যাচ্ছে না। সাজগোজের কোন অভাব না থাকলেও মেলার মুখ কেমন যেন মলিন, ধূসর। একেই করোনা আবহে একটা আতঙ্কের বাতাবরণ যাই যাই করেও রয়ে গেছে। টিকা দেওয়া শুরু হলেও তা কবে সবার কাছে পৌঁছাবে ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে সেটা কেউই জোর গলায় বলছে না। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংটা তাই চালিয়ে যেতেই হবে, মুখে মুখোশটা পরতেই হবে, হাতে স্যানিটাইজার মাখতেই হবে। এমন বাধাধরা অবস্থায় কি মেলায় সেই আনন্দ সম্ভব। উপরন্তু রাজ্যজুড়ে চলতি সপ্তাহেই নানা রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে চলেছে। তাতে ২০২১ পড়তেই শাসকদলের প্রত্যাবর্তন না কি পরিবর্তন— কিসের অপেক্ষায় নবান্ন দিন গুনছে তা সবার মনেই প্রশ্ন।শুভেন্দু অধিকারীর মতো হেভিওয়েট নেতা তথা মন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে গিয়ে তাঁর পুরোনো দলের বিরুদ্ধে যেভাবে তোপ দাগছেন তাতে শাসক শিবিরের নেতাদের মুখে যে যাই বলুক, একটা দুরুদুরু ভাব বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই হাওড়ার নেতা তথা মন্ত্রী লক্ষ্মীরতন শুক্লা দল ও সাময়িকভাবে রাজনীতি ছেড়ে দেবার কথা জানিয়েছেন। তাতে দুরুদুরু ভাবটা অবশ্যই ক্রমবর্ধমান। লক্ষ্মীরতন সম্পর্কে যদিও শাসকদল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভালো ছেলে’ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। ফলে আপাতত লক্ষ্মীর বিরুদ্ধে অ-কথা, কু-কথা তেমন শোনা যায়নি। কিন্তু শুধুমাত্র লক্ষ্মীরতনই নয়, হাওড়া জেলায় তৃণমূল কংগ্রেস দলটাই যে এতদিন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ হয়েছিল সেটা প্রকাশ্যে এসেছে আরও কয়েকজন জনপ্রতিনিধির কথায়। বালির বিধায়ক বৈশালী ডালমিয়া পরিষ্কার বলেছেন, দলে থেকে দলের কাজ করতে না দিয়ে কিছু লোক উইপোকার মত তৃণমূল কংগ্রেসে ঘুণ ধরাচ্ছে। তারাই হলো আসল বিশ্বাসঘাতক। আর এক বিধায়ক জটু লাহিড়ি তো সরাসরি দল পরিচালনায় প্রশান্ত কিশোরের কাজকর্মে রুষ্ট। তিনি বলেছেন, ভাড়া করা কুশলী এনে বাংলায় ভোট করা যায় না। এই মাটির মানুষ অনেক সচেতন। বাংলা বিহার-ইউপি-এমপি-ঝাড়খণ্ড নয়। এর চেয়ে আরও একধাপ এগিয়ে মুখ খুলেছেন, হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র স্বনামধন্য ডাক্তার রথীন চক্রবর্তী। তিনি সরাসরি জেলা নেতৃত্বকে কাজ করতে না দেওয়া এবং রাজ্য নেতৃত্বকে জানিয়েও কোন সুরাহা পাননি বলে বসেছেন। এদিকে শুভেন্দুর পরে তৃণমূল কংগ্রেসের অনেকেই সম্ভাব্য গন্তব্যস্থল বিজেপি বলে মনে করা হচ্ছে। সেটা কি সত্যি? রথীনবাবুর হেঁয়ালি বক্তব্য, যত মত তত পথ। বৈশালী ডালমিয়া বলেছেন, মানুষের কাজ করতে রাজনীতিতে এসেছি, মানুষের সঙ্গেই আগামী দিন থাকব। এরা দুজনেই কিন্তু টিএমসিতেই থাকছি একথা জোর দিয়ে বললেন না। তাই শাসক শিবিরের রক্তচাপ ঊর্ধ্বমুখী হতে বাধ্য। হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিরক্ত। ১ জানুয়ারি দলের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় অন্যান্য নেতাদের অনুপস্থিতি দেখে তিনিও মর্মাহত। সবচেয়ে বড় কথা এই জেলারই নেতা ও মন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জির সদ্যসমাপ্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গরহাজিরা। বেশ কিছুদিন হলো রাজীববাবুও দলের সাংগঠনিক কাজকর্মে বিরক্ত। যারা কাজ করে তাদের ঠেলে সারিয়ে, ঠুটো জগন্নাথ বানিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা হচ্ছে। রাজীববাবুর এলাকার বহু তৃণমূল সমর্থক এই জন্য প্রশান্ত কিশোর এবং তার কুশলী কচিকাচাদের বাহিনীর ক্ষমতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তৃণমূলের হাওড়া জেলায় যখন এমন কাণ্ড চলছে তখনই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ডহারবারের বিধায়ক ও তৃণমূল কংগ্রেস নেতা রাতের অন্ধকারে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও বিজেপির কলকাতা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শোভন চ্যাটার্জির গোলপার্কের বাড়ি গিয়ে দেখা করতে দেখা গেছে। দীপকবাবু যদিও সৌজন্য সাক্ষাৎকার, অনেক দিনের চেনা ইত্যাদি বলে পাশ কাটিয়েছেন, কিন্তু দলের রাজ্যস্তরের নেতারা শোভনবাবুর বাড়ি গিয়ে তাঁর দেখা করে আসাটা মোটেই ভালো চোখে দেখেননি। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির শাস্তির কোপ এই বিধায়কের মাথায় পড়লো বলে। মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বা সাংসদ ডা. কাকলি ঘোষদস্তিদার যেসব ইঙ্গিত দিয়েছেন তাতে তেমনটাই অনুমেয়। শাসক শিবিরের এমন পর্যুদস্ত অবস্থা দেখে স্বভাবতই বিজেপির কিছু নেতা উৎফুল্ল। কিন্তু যারা আদি বিজেপি, তাদের কপালে ভাঁজ পড়ছে। তারা বলছেন টিএমসি-র সবাই যদি বিজেপিতে এসে বারগেনিং করে পদ ইত্যাদি নিতে থাকে তাহলে তাঁরা যাবেন কোথায়! বিজেপি দলটাই তো তাহলে টিএমসি-২ হয়ে দাঁড়াবে। প্রবীণদের এমন কথা একেবারে উড়িয়ে দেবার মত নয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই এই দুটি দলের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে— সাপে কেটেছে মাথায়, তাগা বাঁধবি কোথায়।

Leave a comment