গ্ল্যামার

দেবস্মিতা

নীল আলোয় মাখা মায়াবী ঘরে ঢুকে আগেই লাল ড্রেসটা আনবটন করতে করতেই নরম বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয় ঝিনুক.. ওরফে মডেলিং দুনিয়ার জিনক্স!! শরীরটা খুব টায়ার্ড থাকলেও মনটা আজ যেন স্বপ্নের পাখা ছেড়ে খুব একটা নামতেই চায়না তার। কদিন আগেও কি একবারও ভাবতে পেরেছিল সে এই জায়গায় এমন বিছানায় রিল্যাক্স করার কথা। ছোট শহরের মেয়ে এখানে এসেছিল ভাল কলেজে পড়ার সুযোগের জন্য। কিছু সুপ্ত ইচ্ছে ছিল, যা পরিস্থিতির চাপে প্রকাশ পেত না। হঠাৎই রাকেশ জির সাথে আলাপের পরই…. তার চিন্তায় হঠাৎ ছেদ পড়ল ফোন ভাইব্রেট করায়। জিকোর ফোন। বিরক্ত মুখে কেটে দিয়ে ফোনটা সুইচ অফ করে দিল ঝিনুক। সারাদিনের পর এই এক ঘ্যানঘ্যানানি আর ভাল লাগে না তার।

ড্রেসটার তলায় মোক্ষম জায়গায় দুটো মিলনচিহ্ন শোভা পাচ্ছে। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যভরে জিনক্স একটু বক্র হেসে ক্রিম লাগিয়ে নিল। রাকেশ জির কৃপা!! ওনার কথামতোন আজ দু ঘন্টা বেশী থাকতে হয়েছিল। আজ যেন ফুল মুডে ছিলেন উনি.. পুরো সময় শ্বাস নিতে পারেনি!! ওনারই কথা অনুযায়ী আগে এগোতে হলে মাথায় চিন্তা যতো কম রাখা যায়, ততোই ভাল! ঝিনুকও এখন তাইই করে.. চিন্তা ভাবনার সময়ই বা কোথায়!!!!
আজ শনিবার। কাল আর্লি মর্নিং একটা শুট আছে.. লো নেক টপ তো পড়তেই হবে। তার আগে দাগগুলো মেক আপ হবে তো?? একটু রাগও হল রাকেশ জির ওপর। একেকটা দিন যেন ভূতে পায় ওকে। যদিও আজ সে যেখানেই আছে.. তা শুধু ওনারই জন্য,, তবে তার মাশুলও তো সে দিয়েছে। নিজেকে খোলা পাতার মতোই মেলে ধরতে হয়েছে তার সামনে যখন খুশি ইচ্ছামতোন!! এই সুসজ্জিত টু বেডরুম ফ্ল্যাটও তারই দেওয়া। যদিও তার নিজের ইনকামও এখন কিছু কম নয়,, তবুও এই ফ্ল্যাটটার মায়া সে কেন জানি ত্যাগ করতে পারেনি। তার এই ঘরে এই মায়াবী আলো এক মোহময়ী পরিবেশ তৈরি করে তাকে সবসময় তার স্বপ্নের কথা মনে করিয়ে দেয়!!

ঝিনুকের কথা: ছোট শহরের মেয়ে হলেও ঝিনুকের চোখে স্বপ্ন ছিল অনেক। বাড়িতে বাবা মা বোন তিনজনেই তার জেদ নিয়ে হিমসিম খেত। মডেলিং দুনিয়ায় আসা নিয়েও তাদের আপত্তি সত্বেও তার জেদের জন্যই তা বেশীদিন ধোপে টেকেনি। এখানে এসে প্রথম প্রথম খুব মনখারাপ করত.. মনে হত এই শহরটা একদম অন্যরকম। ধীরে ধীরে এর মায়াবী রূপ তাকে গ্রাস করল। কলেজের একটি ফেস্টে ফ্যাশন শোতে তাকে দেখেই স্পেশ্যাল গেস্ট হয়ে আসা রাকেশ অগ্রওয়াল তার পরের শোর শো স্টপারের অফার দিয়ে বসলেন। ঝিনুকের তো মাথায় হাত!! চেহারায় চটক থাকলে কি হবে, সে যে এ বিষয়ে কিছুই জানেনা। তাকেই কিনা এক্কেবারে শো স্টপার!! তবে সেই শোয়ের পর ঝিনুককে কিছুটা রাকেশ জির কল্যানেও.. আর ফিরে তাকাতে হয়নি।।
পরেরদিন সকাল দশটায় শুট। উঠে ফোন অন করতে না করতেই গাদাখানেক মেসেজ। জিকোর বেশ কয়েকটা। এখানে প্রথম প্রথম আসার পর বেশ ভাব হয়েছিল তার সাথে,, পরে আর তার গায়ে পড়া ভাব সহ্য হয়নি। তা ছাড়া এখন সে যেমন স্ট্যাটাস মেইনটেন করে, তাতে সে ফিটও হয়না! রাকেশ জিও বারণ করেছেন এমন বন্ধু রাখতে। এতে নাকি তার কেরিয়ারে অসুবিধা হতে পারে! বিশেষত: যদি সেই বন্ধু তাকে পড়াশুনাটাও পাশাপাশি চালিয়ে যেতে বলে। ঝিনুক তো আর সেটা করেনি.. প্রথম বছরেই ইতি টেনে দিয়েছে। এসব আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ দেখল রাকেশ জির মেসেজ….
“কল মি, ইটস আর্জেন্ট!!
রাত বারোটার সময় এসেছে মেসেজটা। ততোক্ষণে ঝিনুক ঘুমিয়ে পড়েছিল। সাথে সাথে ফোন করল ওকে। খুব চিন্তান্বিত গলা পেল রাকেশ জির….
“কাম টু মাই অফিস কুইকলি…. নিড ইয়োর হেল্প সুইটহার্ট….
আর কালক্ষেপ না করে তাড়াতাড়ি রেডি হয়েই নিজের আই টেনে চেপে রাকেশ জির অফিসের সামনে গিয়ে পৌঁছায় ঝিনুক। অফিসের মধ্যেও ওনার একটা প্রাইভেট রুম আছে, যাতে বাইরে থেকে কিচ্ছু দেখা যায়না। ঝিনুক ঢুকতেই ঘরে কিছু লোক ছিল, তাদের ইশারায় বেরিয়ে যেতে বললেন রাকেশ জি। তারা বেরিয়ে যেতেই ঝিনুককে কাছে টেনে তার গালে ঠোঁট ছুইয়ে উইশ করেই বললেন….
“ওহহ্ ডিয়ারি তুমি না থাকলে যে আমার কি হত.. তাই ভাবি। এই দেখোনা এতোক্ষণের এতো চিন্তা, এতো টেনশন তোমায় দেখেই একদম চলে গেল….
তাকে ঠিক পড়তে অপারগ ঝিনুক….
“কেন রাকেশ জি,, কি হয়েছে….??

“আর বলো কেন.. মুম্বাইতে আমার যে বাঙ্গলো টা আছে না… সেখানে পরশু দিন রেইড হয়েছে। থানার ওসি আমার জান পহেচানের ছিল.. তাকে বলে ব্যাপারটা তো আমি দাবিয়ে দিলাম। আর ওই শালা ইন্সপেক্টরটাকে ট্রান্সফার করিয়ে ছাড়বো!!

বলতে কি চান রাকেশ জি। এর সাথে তার সম্পর্ক কি, ঠিক বোধগম্য হয় না ঝিনুকের। তার চিন্তায় ছেদ ফেলে রাকেশ জির পরের কথাগুলো….
“আসলে বেপারটা কি জানো, ওই ওসি কেস দাবিয়ে তো দিয়েছে,, বদলে ওরও কিছু দাবী আছে। কেউই তো বিনা স্বার্থ এখন কিছু করে না, জানো তো? সবই বিজনেস.. গিভ্ এন্ড টেক!! তো দাবী কিছুটা ক্যাশে, কিছুটা কাইন্ডে। ক্যাশেরটা তো আমি সামলে নেব.. আর কাইন্ডেরটা বুঝলে কিনা…. মেয়ে অনেক পেয়ে যেতাম আমি,, সকলকে তো আর এই কথা জানানো যাবেনা। সবাইকে কি আর তোমার মতোন বিসোয়াস করা যাবে?? আজকের দিনটা গোছগাছ করে নাও। কাল আর্লি মর্নিং ফ্লাইট ফর ওয়ান উইক। যাও মুম্বাই ঘুরেও এস। আই নো ইউ ক্যান হ্যান্ডেল ইট ওয়েল জিনক্স….
বলেই একটা উয়িংক করলেন রাকেশ জি ওরফে ফ্যাশন দুনিয়ার বিগ শট রাকেশ অগ্রওয়াল। ঝিনুক কি বলবে ভেবেই পেল না।

ঘর থেকে যখন বেরিয়ে এল ঝিনুক, তার শরীরটা যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ যেন বড্ড শ্রান্ত লাগছে তার। চোখটাও কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু কেন? এমন জীবনই তো সে চেয়েছিল!! তাই তো বাবা মা বোন জিকো কারুর সাথেই আজ কতোদিন সেভাবে কথা বলতেই ইচ্ছা হয়নি। তবে আজ রাজ্যের ক্লান্তি খেদ এসে ঘিরে ধরছে কেন তাকে?? কেন?? বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে কি সিঁড়ি বাইবার সময়????

রুম থেকে বেরিয়ে করিডর দিয়ে হাঁটার সময় আবার একটা নীল আলো যেন ঘিরে ধরল তাকে। শুধু তফাৎ এই আলো আর মায়াবী নয়.. বিষাক্ত, খুব বিষাক্ত। সেই বিষাক্ত আলোয় যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে তার মন প্রাণ। চোখের সাথে সাথে আশেপাশেও শুধু অন্ধকারই দেখল ঝিনুক ওরফে আমাদের জিনক্স।।

One thought on “গ্ল্যামার

Leave a comment