চন্দ্রাণী সাধুখাঁ (বিশ্বাস)
একেবারে সমতল একটা জায়গা। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস এসে থামছে। সকলের মুখ হাসি ঝলমলে। একটা বিরাট বটগাছের তলায়. বড়বড় ত্রিপল আর শতরঞ্চি পাতা হল। রাঁধুনিদাদা চা বসিয়ে দিলেন। পাশেই ট্যাপ ওয়াটার।
তন্ময় ব্যাগ খুলে ব্রাশ বের করতে যাচ্ছিল।
কিন্তু পিউ তাকে টেনে নিয়ে গেল পাহাড়ের সোজাসুজি। মিতুলের হাতে নিজের মোবাইলটা ধরিয়ে দিয়ে বললো, এই মিতুল, পাহাড়ের সাথে আমাদের কটা ছবি তুলে দে তো!
ছবি তোলার ফাঁকেই তন্ময়ের কানে কানে পিউ বলে উঠলো, জানি তুমি আমায় ভালোবাসো না। তাই এই ছবিগুলোই আমার সারাজীবনের সঞ্চয় করে রাখলাম। আমি যে আর অন্য কারোকে…
পিউ কথা শেষ না করলেও তন্ময় বুঝতে পারে পিউয়ের গলাটা কেন ভারী হয়ে এলো। বড় অভিমানী মেয়েটা! তন্ময় কথা না বলে ওর নাকটা একটু নেড়ে দেয়। আর সে দৃশ্যও মোবাইলবন্দি করে মিতুল।
চা খেয়ে বাথরুম যাওয়ার পালা। মিতুল হাসতে হাসতে আঙুল তুলে দেখালো পঞ্চাশ মিটার দূরের ‘USE &PAY’ টয়লেটের দিকে। পিউ রেগে আগুন হয়ে যায়।
তবে কাছে গিয়ে ঝকঝকে পরিস্কার বাথরুমটা দেখে খুশীই হয়। ফিনাইল আর ব্লিচিং পাউডারের গন্ধে চারপাশ মাতোয়ারা। সদ্য পাম্প চালিয়ে ট্যাঙ্ক ভর্তি করা হয়েছে। সেই জলে স্নানটাও সেরে নিল ওরা দুজনে।
এরপর লুচি, আলুরদম, মোয়া আর মিষ্টির ব্রেকফাস্ট। ওদিকে তখন পাহাড়ের ঘুম ভেঙেছে। মাইকে ঘোষণা শুরু হয়েছে প্লাস্টিক বা থার্মোকলের প্লেট ব্যবহার করবেন না। বাইরের গাড়ি বুক করবেন না। বিপদ হতে পারে। আমাদের সিন্ডিকেটের গাড়ি নিয়ে পাহাড়ে উঠুন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ইতিমধ্যে মিতুল আর তন্ময় একটা গাড়ি বুক করে ফেলেছে।
প্রথমে বলে ছিল, দু’হাজার টাকায় ভিউ পয়েন্ট রামমন্দির,ময়ূর পাহাড়, আপার-লোয়ার ড্যাম, বামনি ফলস্ ইত্যাদি ঘুরিয়ে দেখাবে। শেষমেশ চোদ্দশো টাকায় রফা হল। মারুতি ওমনির সামনে বসলো সুদীপের ছেলে। আর পিছনের দুটি সীটে তন্ময়, পিউ, মিতুল ওর স্ত্রী ববি, সুদীপ আর ওর স্ত্রী রঞ্জু।
গাড়ি পাহাড়ি পথ ধরতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ। কোথাও ধানের ক্ষেত তো কোথাও সবজি বাগান। মাঝে মাঝে শাল-পিয়াল গাছের দল সার বেঁধে অঅভ্যর্থনা জানাচ্ছে। অযোধ্যা পাহাড় হল দলমা পাহাড় ও পূর্বঘাট পাহাড়ের একটি সম্প্রসারিত অংশ।
হঠাৎই নজরে পড়লো খুব কাছে চলে আসা কুয়াশা ঢাকা পাহাড়। উত্তেজিত হয়ে সুদীপের ছেলে জিজ্ঞেস করলো “আমরা কি এই পাহাড়েই উঠব?
ড্রাইভার সায় দিয়ে বলল, হিঁ উই পাহাড়েই যাব্যে বটে।
সকলেই গল্প ভুলে হাঁ করে জানলা দিয়ে দেখতে লাগলো ধূসররঙা পাহাড়ের বুকে রোদ কুয়াশার খেলা।
বেশ খানিকক্ষণ যাবার পর এক জায়গায় গাড়ি থামালো ড্রাইভার মহেশ্বর।
দাদারা, ইটা একটা ভিউ পয়েন্ট বটে। লীচের দিক্যে তাকাল্যে ইকটা চমৎকার দিশ্যো দেখতে পাব্যে। — এই রুক্ষ মাটির দেশে মহেশ্ববরের কথাগুলো যেন ভারি মিষ্টি শোনাচ্ছিল সকলের কানে। এখানে যেন এমনটাই মানায়।
তার কথায় নীচের দিকে তাকিয়ে সকলেই দেখলো, সত্যিই পাক খেতে খেতে পাহাড়ের গায়ে গায়ে রাস্তাটা কীভাবে উপরে উঠে এসেছে। এখানে বসে এই স্বর্গীয় দৃশ্য উপভোগ করার জন্য কয়েকটি বসার জায়গাও আছে। চতুর্দিক জনমানবহীন। মহেশ্বর বললো, এখানকার স্থানীয় পুরুষরা জনমজুরের কাজ করে আর মেয়েরা জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। সেসব বিক্রি করে ওদের সংসার চলে।
আবার গাড়ি চললো। ওরা পৌঁছে গেল পাহাড়ের মাথায় — হিলটপ। এখানে কিন্তু সবই তো সমতলভূমির মতো। চাষের ক্ষেত, পাকা বাড়ি, সবই রয়েছে।
আবার এগিয়ে চলা। লক্ষ্য রামমন্দির। এখানে দর্শনীয় রাম মন্দির, রাম মন্দিরের মূর্তি,রাম মন্দিরের দেওয়াল চিত্র, জটায়ু বধ। প্রতিটি স্থাপত্যে, নকশায় ও গঠনশৈলীতে স্থানীয় আদিবাসী প্রভাব স্পষ্ট। ওরা যখন পৌঁছালো মন্দিরে পূজা হচ্ছে। আরতির বাজনাগুলি অনেকটা প্রাচীন রণবাদ্যের মত।
অনেকে মনে করেন, পুরুলিয়ায় অযোধ্যা পাহাড়েই ছিল রামচন্দ্রের রাজধানী। এখানে গাছে গাছে ঝুলতে দেখা যায় পরজীবী স্বর্ণলতা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস, এগুলি নাকি সীতা মায়ের স্বর্ণকেশ। সীতার চুল-ও বলে থাকেন অনেকে। সত্য যাই হোক না কেন, পরিবেশের গুনে পিউ যেন বিশ্বাস করে ফেলছিল এই সমস্ত প্রবাদকে। নিজেও হারিয়ে যাচ্ছিল সেই রামায়নের কালে। এবড়ো খেবড়ো মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে তন্ময়ের হাত আঁকড়ে ধরেছে দুজনের কেউই খেয়াল করেনি।
এরপর ওরা এগিয়ে গেল ময়ূর পাহাড়ের দিকে। এখানে পাথরের ওপর পা ফেলে ফেলে হেঁটে উঠতে হয় প্রায় তিরিশ-চল্লিশ ফুট। গাড়ি থেকে নামার সময়ই ঘটলো বিপদটা। হঠাৎ যেন মাথাটা ঘুরে গেল পিউয়ের। চোখের সামনে সব অন্ধকার। ও বুঝতে পারলো ও পড়ে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে তন্ময়কে ধরতে গিয়েও ছুঁতে পারলো না। আছড়ে পড়লো পাথুরে মাটিতে। সে আওয়াজে ছুটে এলো সকলেই। ওকে ধরে তোলা হলো। বিশ্রীভাবে কেটে গেছে হাত, থুতনি। জিনস্ প্যান্ট পরে থাকা সত্বেও ছড়ে গেছে দুই হাঁটু। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারাত্মকভাবে ফুলে গেল পায়ের পাতা।
তন্ময়কে যেন দিশেহারা লাগছিল। বললো, আর পাহাড়ে উঠবো না। আমরা নীচে থাকছি। বাকিরা বরং ঘুরে আসছি।
বাদ সাধল পিউ। বললো, ইস্ এসেছি যখন সব দেখেই ফিরবো।
তন্ময়ের কাঁধে ভর দিয়ে একটা একটা করে পা ফেলে ওরা উপরে উঠতে লাগলো।
ছোটো পাহাড়। কিন্তু চারপাশ আরো পাহাড় দিয়েই ঘেরা। চোখ জুড়োনো দৃশ্য।এর মাথাতেও আর একটি ছোটো রাম মন্দির রয়েছে। এখান থেকে চতুর্দিকের দৃশ্য বড়ই মনোরম। এখানেও সুদৃশ্য বেঞ্চ পাতা। বেশ কিছু ছবি তুলে আবার তন্ময়ের কাঁধে ভর দিয়েই নীচে নামলো পিউ।
সে বুঝতে পারছিল, তন্ময় তার সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে। তবে কি তন্ময় এখনও তাকে এতটাই ভালোবাসে? পিউ খেয়াল করলো, এখানে আসার পর বা সারারাতেও তন্ময় একটিবারও ফোনের দিকে তাকায়নি বা কারোকে ফোন করেনি। তবে কি পিউয়ের সব ধারণাই ভুল?
এবার আবার বেশ কিছুক্ষণ ধরে জঙ্গলের পথে চলা। শালের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের বুকে তৈরি করা কংক্রিটের, কখনও পিচের সেই রাস্তায় কখনও আলো, কখনও অন্ধকার।
মাঝে মাঝেই রাস্তা ভিজে গেছে চুঁইয়ে আসা জলের ধারায়। কে জানে কোথা থেকে আসছে এই জল, আর কোথায়ই বা যাচ্ছে?
খানিক পরে আবার এক পাহাড়ের গায়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মহেশ্বর বলল, এই পাহাড় কেটে কেটে পাথর নিয়ে গিয়েই তৈরি করা হয়েছে ড্যাম।
সত্যিই তাই! সামনে যে পাহাড়টি রয়েছে তার গা ঘেঁষে গভীর এক খাদ। দেখে মনে হচ্ছে কত সহস্র বছর ধরে না জানি এই খাদে বৃষ্টির জল জমতে জমতে এক গভীর হ্রদের সৃষ্টি করেছে। কালচে সবুজ সেই জলের দিকে তাকালে বেশ ভয়ই করে। অতলান্ত তার আহ্বান। বিপজ্জনক খাদের দিকে চেয়ে তন্ময় ভাবছিল, সে যেন সেই রামায়নের কালেরই এক সাধারণ মানুষ। জঙ্গলেই তার বাস। বনের ফলমূল আর এই হ্রদের জলেই তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়। আর পিউ তার ছায়াসঙ্গিনী এক আদিবাসী কণ্যা।
আবার ছুটে চলা। গন্তব্য বামনি ফলস্। পিউয়ের পায়ে তখন বেশ যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। রঞ্জু ব্যাগ থেকে একটা মুভ-এর টিউব বের করে দিল। তন্ময় নিজের কোলে পিউয়ের পা-টা তুলে নিয়ে ভালো করে সেটা লাগিয়ে দিতে লাগলো। পিউ যেন সব ব্যথা ভুলে যাচ্ছিল তন্ময়ের ছোঁয়ায়।
বামুনকাটা পাহাড় থেকে নেমে এসে ব্রাহ্মণী ঝোরা নাম নিয়েছে বামনী ফলস্। পুরুলিয়ার সবচেয়ে সুন্দর আর আকর্ষণীয় ঝর্না। পিউ তা দেখে লোভ সামলাতে পারলো না। বিশাল পাথরের উপর বসে জলে পা ডুবিয়ে রইল বহুক্ষণ।তন্ময়ও ওর পাশে বসে রইল। ওরা দেখতে পাচ্ছিল অনেকেই স্নান করছে । এসব ঝোরায় এমনিতে তেমন বিপদ না থাকলেও, মাঝেমধ্যে হড়কা বান আসার ফলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়।
মহেশ্বরের তাড়ায় আবার নীচে নেমে ফিরে চলা। সকলের পেটেই তখন খিদের আগুন জ্বলছে। পিকনিকের জায়গায় ফিরে ওরা দেখলো রান্নাবান্না শেষ। খাওয়ার ব্যবস্থা করছে প্রনবদা আর রাঁধুনিদাদা।
পিউয়ের অবস্থা দেখে সকলেই হই হই করে উঠলো। সকলের একটাই প্রশ্ন, পড়ে গেলে কি করে?
পিউও যেন মনে করতে পারছিল না, কেন সে পড়ে গেল!
গরম ভাত, সবজি ডাল, ফুলকপি মাখানি, মাটন কারি, চাটনি, পাঁপর আর মিষ্টি দিয়ে ভরপেট খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম। কিন্তু পিউয়ের যেন স্বস্তি হচ্ছিল না।
হঠাৎই ও ছুটলো একটু দূরে। হড়হড় করে বমি করে উগড়ে দিল দুপুরের সব খাবার। আবার যেন চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। কিন্তু তন্ময়ের বলিষ্ঠ হাতদুটো এবার আর তাকে পড়ে যেতে দিল না। পিউকে ধরে ধরে এনে সঙ্গে আনা বেডশীট পেতে শুইয়ে দিল তন্ময়।
হঠাৎ এগিয়ে এলো সমীরদার জামাই সায়ন্তন। পেশায় ডাক্তার। তন্ময়ের অনুমতি নিয়ে পিউকে একবার পরীক্ষা করতে চাইলো। দিশেহারা তন্ময়ের অনুমতি না দিয়ে উপায় ছিল না।
চোখ, জিভ, পালস্ পরীক্ষার পর হেসে ফেললো সায়ন্তন। ফিচেল হাসি হেসে বলে উঠলো, মিতুলদা, আগামী পিকনিকে আপনার একটা ক্যান্ডিডেট বাড়ছে। আর তন্ময়দার কাছ থেকে এ পিকনিকের জন্য আড়াইজনের টাকা নেবেন কিন্তু!
তন্ময়ের বুকটা ধড়াস করে উঠলো। তার আর পিউয়ের সন্তান— সে বাবা হবে! পিউকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল খুব। অথচ বোকা পিউ সায়ন্তনকে জিজ্ঞাসা করেই চলেছিল, কেন কি হয়েছে আমার? বলো না প্লিজ!
ঘন্টাখানেক পর আবার গাড়ি ছুটলো পাখি পাহাড়ে। এখন পিউ নিজেও খুব সাবধানে হাঁটছে। পাখি পাহাড়ে পৌঁছে মন ভরে গেল সকলেরই।
শিল্পী চিত্ত দে’র তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু শিল্পী একটি ছোটখাটো পাহাড়কে খোদাই করে তার গায়ে নানান পাখির ছবি আঁকার কাজ করে চলেছেন সেই ১৯৯৬ সাল থেকে। যে দিকে তাকাও শুধু পাখি আর পাখি। কোথাও কোথাও স্কেচ করা আছে। পরের বার এসে হয়তো ওদের ডানা মেলতে দেখবে।
এবার শেষ গন্তব্য চড়িদা। চড়িদা ছৌ নাচের মুখোশের জন্য বিখ্যাত। এখানে কাগজের মন্ডের উপর রং করে বাহারি মুখোশ বানানো হয়। খুবই সস্তা। মাত্র পঞ্চাশ টাকা থেকে শুরু করে আড়াই-তিন হাজারেরও মুখোশ আছে। নির্ভর করে মাপ আর কারুকার্যের সূক্ষ্মতার উপর। পিউ তো বেশ কয়েকটা মুখোশ কিনে ফেললো। তন্ময়েরও খুব ভালো লাগছিল। ভাবছিল, ফিরে গিয়ে বাড়িটা আরও সুন্দর করে সাজাতে হবে। নতুন অতিথির জন্য।
রাতের খাওয়া সেরে বাস ছাড়লো রাত আটটা নাগাদ। সেই একই সীটে ফেরা। ফেরার সময় সকলেরই মন বিষন্ন। বড় তাড়াতাড়ি যেন সময়টা ফুরিয়ে গেল।
গভীর রাতে ছুটন্ত বাসের ফাঁকফোকর দিয়ে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল। কেঁপে উঠছিল দুজনেই। পিউয়ের গায়ে শালটা ভালো করে জড়িয়ে দিতে দিতে পিউয়ের কানে কানে তন্ময় বলে ওঠে, আমার কিন্তু একটা ছোট্ট পিউ চাই।
পিউ লজ্জায় তন্ময়ের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বলে, কক্ষনো না! পিউ একটা ঝগড়ুটে মেয়ে। তোমায় শুধু কষ্ট দেয়। ভগবান যেন একটা ছোট্ট তন্ময় দেন, ঠিক তোমার মত।
তন্ময় আরও আঁকড়ে ধরে পিউকে। আর দুজনেই মনে মনে ভাবে, আবার আসতে হবে এখানে। তবে এবার আর দুজনে নয়, তিনজনে।
রাতের অন্ধকার চিরে তখন বাস ছুটে চলেছে ‘সুখের বাসা’-র দিকে। (শেষ)
