মেঘমালা আইচ রায় ।।
প্রথমার্ধে নৃত্যের ইতিহাস ও কত্থক নৃত্যের আবির্ভাবের কথা আলোচ্য হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে কত্থক নৃত্যের আরও কিছু তথ্যের সম্পর্কে অবগত হওয়া যাক।
কত্থক নৃত্যের ঘারানা : মুঘল আমলের শেষ থেকেই নৃত্যশিল্পীরা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন এবং তাদের নৃত্যের শৈলী পরবর্তীকালে দুটি ঘরানার নামে নামকরণ হয় (১) লখনউ ঘরানা (২) জয়পুর ঘরানা। কিছু পরে আরো একটি ঘরানার প্রবর্তিত হয় সেটি (৩) বেনারস ঘরানা।

লখনউ ঘরানা : সুবিখ্যাত প্রতিষ্ঠিত নৃত্যশিল্পী ঠাকুর প্রসাদ জির তিনপুত্র – অড়গুজি, খড়গুজি ও তেলগুজি তাঁরা ও নৃত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এনাদের মধ্যে অড়গুজি তাঁর তিন পুত্র – প্রকাশ জি, দয়াল জি এবং হীরালাল জিকে তাঁর পিতা উত্তম ভাবে নৃত্য শিক্ষা দেন। তাঁদের পিতার মৃত্যুর পর তাঁরা লখনউ চলে আসেন। প্রকাশ জি-র তিন পুত্রের মধ্যে এবার ওয়াজিদ আলীর নৃত্যগুরু ঠাকুর প্রসাদ জী লখনউ ঘরানাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এই ঘরানাকে আর সুবিস্তার করেন ঠাকুর প্রসাদ জির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দুর্গাপ্রসাদ জির তিনপুত্র -বিন্দাদিন মহারাজ জী, কালিকাপ্রসাদ জী ও ভৈরপ্রসাদ জী। এনাদের মধ্যে বৃন্দাদীন মহারাজ জী তাঁর শৈলী ও ভাবের দ্বারা এবং কালিকাপ্রসাদ জি তাঁর তাল ও ছন্দের দক্ষতা দিয়ে জনসাধারণের প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কালিকাপ্রসাদ জির তিন পুত্র – অর্জুন মহারাজ, লাছু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজ তাঁদের নৃত্য শৈলী দ্বারা লখনউ ঘরানাকে আরো বেশি সমৃদ্ধ ও প্রসারিত করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই ঘরানার নৃত্যশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাঁরা হলেন আচ্ছন্ন মহারাজের পুত্র বিরজু মহারাজ জি, রামনারায়ন জি, সিতারা দেবী জি, রশোন কুমারী জি, গোপীকৃষ্ণ জি, বেলা অর্ণব জি আর প্রখ্যাত ও সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা।

লখনউ ঘরানায় সাধারণত তোড়া, টুকরা, ভজন, ঠুমরি, কবিত্ব প্রভৃতির সমাবেশ থাকে। এই ঘরানায় নৃত্যের বোলগুলি ছোট এবং শ্রুতিমধুর হয় এবং ভাব ও অভিনয়ের সঙ্গে তাল ও ছন্দের সামঞ্জস্যতা অতুলনীয়।
জয়পুর ঘরানা : এই ঘরানার প্রবর্তন করেন ভানুজি। জয়পুর ঘরানার জন্মস্থান হিসেবে রাজস্থানকে বলা হয়। পুরাতন কথায় কথিত আছে ভানু জি এক শিবভক্ত সন্ন্যাসীর থেকে শিব তাণ্ডব নৃত্যের শিক্ষা নেন এবং পরে তাঁর পুত্র মালুজিকে সেই শিক্ষাই দান করেন। উত্তরাধিকারী হিসাবে মালুজির পুত্ররাও এই নৃত্য শিক্ষায় পারদর্শী হন। মালুজি-র পুত্র কানু জি প্রথম বৃন্দাবনে গিয়ে লাস্যভাব যুক্ত “রাধাকৃষ্ণ লীলা” রচনা করেন এবং নৃত্যের ধারা প্রবাহমান রাখেন। কানু জির পুত্র গিরিধারী জি এবং তাঁর পাঁচ পুত্রের দুলহাজি জয়পুর ঘরানাকে আরো বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

জয়পুর ঘরানার নৃত্যের বোল লখনউ ঘরানার বোলের থেকে বড় হয়। এই ঘরানায় ভাব ও অভিনয়ের থেকে লয়ের প্রাধান্য বেশি থাকে। নৃত্য থেকে নৃত্তের প্রয়োগ বেশি থাকে।
বেনারস ঘরানা : জানকী প্রসাদ প্রবর্তিত বেনারস ঘরানা জয়পুরেরই একটি শাখা। এই ঘরানা ও লখনউ ঘরানার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না। জয়পুর ঘরানার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে রাজস্থানে ‘শ্যামল দাস’ নামক একটি পৃথক ঘরানা ছিল। এই শ্যামল দাস ঘরানাই বিভক্ত হয়ে একটি জয়পুর ঘরানা এবং অন্যটি বেনারস ঘরানার নামে পরিচিতি অর্জন করে। বেনারস ঘরানা আধুনিককালে গোপি কিষণজি-ই ধারক ও বাহক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
বেনারস ঘরানায় লখনউ ঘরানার মতই ভাব ও অভিনয়ের এবং তাল ও ছন্দের মিশ্রণের উপর সৌন্দর্যতায় গঠিত। কিন্তু এই ঘরানায় মুদ্রা জয়পুর ও লখনউ ঘরানার থেকে অনেক বেশি স্বতন্ত্র। এই ঘরানাই শুধুমাত্র নৃত্যের বোল-ই প্রয়োগ হয়, জয়পুর ও লখনউ ঘরানার মতন তবলা ও পাখোয়াজের বোল ব্যবহৃত হয় না।
কত্থক নৃত্যের ইতিহাসের দ্বিতীয়ার্ধ সমাপ্ত হল, ঘরানার বিভিন্ন প্রকারের মাধ্যমে। তৃতীয়ার্ধে আরও কিছু তথ্যের ওপর আলোকপাত করা হবে।
