ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল : এক সেবাময়ী মা-র জীবনদর্শন

কুশল মৈত্র

সালটা ২০২০। বিষ আর বিষ। সত্যি কি বছরটা বিষবৃক্ষে আক্রান্ত! শুরুটা বেশ হলেও সামান্য কিছুটা পথ স্বাচ্ছন্দ্যে চলার পর বিশ্বমানব ধীরে ধীরে বড়ই অস্থির হয়ে উঠছে। চেনা পৃথিবীটা বদলে গেছে মুহূর্তে। চিনের উহান থেকে উদ্ভূত করোনা নামক এক ক্ষুদ্র অদৃশ্য দানব সবাইকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যার ফলে বিশ্ব তথা দেশ সর্বত্র লকডাউন। গোটা বিশ্ব আজ স্তব্ধ, আতঙ্কিত, করোনা অতিমারীর প্রভাবে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছি আমরা। স্বয়ং ঈশ্বরও করোনাতঙ্কে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। নিভৃতবাসে মানুষ আজ নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করে চলেছে সর্বক্ষণ। পৃথিবীজুড়ে নেমে আসছে শ্মশানের নীরবতা। শুধু কি করোনা নিয়ে ভয়াবহতায় দিন গুনছি আমরা! তাও না! দিনের পর দিন মাসের পর মাস লকডাউন বাড়তে বাড়তে আমরা হাঁপিয়ে উঠছি ক্রমশ। দেশ ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রাণঘাতী এই করোনা ভাইরাসে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিল্প, শিক্ষা সমস্ত দিকগুলি অন্ধকারে ছেয়ে আসছে, কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি ক্রমশ। ক্ষুদ্র ভাইরাসটি তালা বন্ধ করে দিয়েছে সব কিছু। তবুও আমরা এগিয়ে চলেছি নতুন আলোর সন্ধানে। সে আলোয় হয়তো এক আলোকবর্তিনী মা-ই আমাদের এ বছরে পথ চলতে শিখেয়েছেন।

জানি পৃথিবীর এই কঠিন অসুখ একদিন নির্মূল হবেই। আর তার জন্য চাই দৃঢ় মনোবল। যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ডাক্তার-নার্স তথা সেবিকারা দিনরাত চোখের পাতা এক না করে নিরলস ভাবে সেবা করে যাচ্ছেন, ডাক্তারদের পাশাপাশি নার্সরূপী সেবিকারা আজ গোটা বিশ্বকে করোনা মুক্ত করতে যেভাবে নিরলস শ্রম দিয়ে দৃঢ়চেতা মানসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তা দৃষ্টান্ত স্বরূপ। প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ যত ছড়িয়েছে ততই বেড়েছে নার্সদের ডিউটির সময় ও ধৈর্যের অসীম পরীক্ষা। সঙ্গে রোগাক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কও নার্সদের কম নয়। কিন্তু এ সব কিছুকে কোনো প্রশ্রয় না দিয়ে তাঁরা সেবা করেছেন যাচ্ছেন সুস্থ সমাজ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে। সমূহ বিপদকে নস্যাৎ করে দিয়ে করোনা রোগীদের যে ভাবে সুস্থ করে তুলছেন তা সত্যিই স্যালুটের বিষয়। আগামী প্রজন্ম ঈশ্বররূপী এই সেবাময়ী নার্স তথা সেবিকাদের অবশ্যই মনে রাখবে, কীভাবে তারা করোনা অতিমারীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন নিঃস্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

এই নার্সদের কথায় মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ব্রিটিশ সেবাময়ী মা-র কথা। ইতিহাসের পাতায় এখনো জ্বলজ্বল করছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। যিনি সমগ্র বিশ্বের নার্সদের অনুপ্রেরণা। হয়তো ঈশ্বরের দূত হয়েই এসেছিলেন পৃথিবীতে। ছোটবেলায় স্কুলের ইংরেজি পাঠ্যবইতে (যতদূর মনে পড়ে অষ্টম শ্রেণি) পড়েছি ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’। প্রদীপ হাতে যিনি একাই আহত সৈনিকদের সেবা করে যেতেন গুমোট অন্ধকারে, এ ঘর থেকে সে ঘর। সমস্ত ঘরগুলিতে থাকা রোগীরা তাঁর চোখের আড়াল হতো না। সবই তাঁর নখদর্পণে। দুঃস্থদের জন্য দিনরাত এক করে তিনি সেবা করে যেতেন। তাই তো বলাই যায়— রাত্রি ঘনঘোর, উজ্জ্বল ভোর দিবস রজনী–তুমি দীপ হাতে রমণী।

২০২০ সালের ১২ মে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মের দু’শো বছর পূর্ণ হল। আর এই ২০২০ সালেই করোনা-ক্রান্তিকালের দুঃসময়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বছরটিকে ‘ইয়ার অব দ্য নার্স অ্যান্ড মিডওয়াইফ’ ঘোষণা করলেন। সবার অগোচরে থেকে গেলেও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামটিকে কেউ সেভাবে ভুলতে পারেনি। তিনি চিরদিনই দুঃস্থের আর্তের সেবায় ধাত্রী হিসাবে আশার আলোয় সেবাময়ী জননী রূপে বিরাজমান আছেন।

 ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১৮২০ সালের ১২ মে ইটালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। এই ফ্লোরেন্স শহরটির সুন্দর নামটির নামেই নামকরণ হয় তাঁর। পিতার নাম ফ্রান্সেস নাইটিঙ্গেল আর মাতা উইলিয়াম নাইটিঙ্গেল। পিতার কাজের সুবিধার্থে জন্মের এক বছর পরেই সপরিবারে ফ্লোরেন্স চলে আসে ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডেতেই স্কুল-কলেজ, বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সেবামূলক কাজে ঝোঁক ছিল বড় বেশি। দুঃস্থ,গরীব, আহত ব্যক্তির জন্য কিছু করার প্রচেষ্টায় সদা উদগ্রীব।

বেশ সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত ব্রিটিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ছাত্রজীবনে অঙ্ক এবং পরে রাশিবিজ্ঞান ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয়। তখনকার দিনে কোনো বড়লোকের মেয়েরা তথা হাইস্টেটাসসম্পন্ন ঘরের মেয়েরা সাধারণত নার্স হতে চাইলে বাড়ির লোকের ছিল ঘোর আপত্তি। সমাজ সেটাকে ঠিক মেনে নিতে পারত না। নার্সিংটা বেশ অবজ্ঞার চোখেই দেখতো উচ্চবিত্তশালী লোকেরা। নার্সিং পেশাটা সাধারণত গরীব, না খেতে পাওয়া ঘরের মেয়েরাই করতো। কাজেই ফ্লোরেন্সের নার্সিং নিয়েও তাঁর বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের ঘোর আপত্তি ছিল। বড় ঘরের মেয়ে সে কিনা হবে নার্স! বাড়ির কথায়, চাকরি যদি করতে হয় বড় চাকরি করবে, কিংবা বিয়ে করে সংসার ধর্ম করবে। কিন্তু ফ্লোরেন্সের জেদের কাছে সকলেই পরাজিত হয়। বাড়ির আপত্তি, তৎকালীন উচ্চবর্ণের সমাজের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে নার্সিং পড়তে ভর্তি হলেন লন্ডনে। তখন ফ্লোরেন্সের বয়স মাত্র চব্বিশ বছর। দুর্দান্ত সাহসিকতা আর দৃঢ় মন নিয়ে ফ্লোরেন্স বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে একজন মিশনারীর উদ্যোগ নিয়ে অসুস্থ ও আহতদের নিঃস্বার্থ সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর সুদীর্ঘ জীবন।

ইটালির রোমে তাঁর আলাপ হয়েছিল সিডনি হার্বাটের সঙ্গে। সিডনি হার্বাট ছিলেন ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ব্রিটিশ যুদ্ধসচিব। সিডনির সঙ্গে ফ্লোরেন্সের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আজীবন। ১৮৪৯-এ মিশর ও গ্রিস সফরে একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন ফ্লোরেন্স। সেখানকার অসুস্থ অসহায় মানুষদের দুর্দশা দেখে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন। অসুস্থদের পাশে দাঁড়াতে তাদের সেবা করার জন্য তাঁর মন কেঁদে উঠতো। তিনি মনে মনে স্থির করলেন সেবাই হবে তাঁর একমাত্র ধর্ম এবং সেই পথেই পা বাড়ালেন।

মূলত বন্ধু সিডনি হার্বাটের ডাকেই ফ্লোরেন্স ক্রিমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে সেবাকাজে যুক্ত হন। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় (১৮৫৩-১৮৫৬) ফ্লোরেন্স আটত্রিশ সদস্যের নার্সিং দলের সুপার হয়ে ইটালি থেকে তুরস্কের স্কুটারিতে ব্রিটিশ সেনা হাসপাতালে যান। ইউরোপের দেশগুলি তখন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় উদগ্রীব। রাশিয়া-ফ্রান্স-ব্রিটেন প্রভৃতি দেশগুলি মেতে উঠেছিল সাম্রাজ্য দখলের লড়াইয়ে। নিজেদের প্রভাবশালী তকমা দেখাতে ক্ষমতার বড়াই করতে যুদ্ধ যুদ্ধ লালসার খেলায় তিক্ততা চরমে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের আবহে চারিদিকের বাতাস তখন ঘন বারুদে পূর্ণ। যুদ্ধে আহত সৈন্যদের পাঠানো হতো ব্রিটিশ সেনা হাসপাতালে। হাসপাতালে আহত সৈন্যদের দেখে ফ্লোরেন্স আঁতকে উঠেছিলেন। সৈনিকদের প্রাণঘাতী চোট-আঘাত, বিষাক্ত সংক্রমণ আর মৃত্যুর মিছিল দেখে তিনি হতবাক। হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে থাকা সৈন্যদের নিথর দেহ আর গুরুতর আহত সৈন্যদের আর্তনাদ ফ্লোরেন্সের মনকে ব্যথিত করেছিল। নিত্য শত শত সৈনিকের মৃত্যু তাঁকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই নিজের টাকা খরচ করে হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নতি সাধনে চেষ্টা করেন। সাথে সাথে আহতদের দিনরাত শুশ্রুষা সেবা করার নিরলস প্রচেষ্টা সে সময় সকলকে বেশ অবাক করে দিয়েছিল।

ফ্লোরেন্সের উৎসাহেই সেই সময় অনেক সেবিকাই এগিয়ে এসেছিলেন রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হতে। সেনা হাসপাতালের সমস্ত যোদ্ধারা ফ্লোরেন্সকে এক বাক্যে চিনতেন। তাদের সঙ্গে ফ্লোরেন্সের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে। আহত সৈন্যদের সঠিক ভাবে সেবা করার কাজে ব্যস্ত থাকায় তাকেও রীতিমতো বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি এসবকে কোনো রকম পাত্তা না দিয়ে দিনরাত সেবা করে যান এবং সৈন্যদের কাছে আশার আলোর এক নতুন রশ্মি আনেন। রাতে রোগীদের সঙ্গে দেখা করার সময় তিনি হাতে সবসময় একটি প্রদীপ নিয়ে চলতেন এবং সেই থেকেই তিনি ধীরে ধীরে ‘ল্যাম্প উইথ দ্য লেডি’ বা ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে নতুন ভাবে সকলের কাছে পরিচিতি পেলেন। আহত রোগীদের কে কেমন আছে তা জানতে, তাদের বাড়িতে টাকা পাঠাতে এমনকি বাড়ির লোকদের জন্য চিঠি লিখে দেওয়া, তাদের সাথে ভালোমন্দের শেয়ার করা, বই পড়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি সবই করতেন। মা-রূপী এই মহিয়সীসেবিকা।

শুভ্র বেশ, প্রশান্ত চোখ, স্নিগ্ধ ভালোবাসা, নিরাময়-স্পর্শ এই যুবতীর বয়স তখন ত্রিশের দোরগোড়ায়। এমন শান্ত, বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ মেয়েই ছিলেন প্রথম মহিলা নার্স, যিনি সৈন্যদলের সুপার নিযুক্ত হয়েছিলেন। নার্সিংয়ের ছোট ছোট দল করে তিনি বেরিয়ে পড়তেন হাসপাতাল পরিদর্শন করতে। সৈন্যদের তথা মিলিটারি হাসপাতাল দেখে তিনি খুব হতাশ হয়েছিলেন। চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যত্রতত্র নোংরা ছড়ানো ছিটানো এমনকি অসুস্থ সৈন্যদের নোংরা বিছানা, নিম্ন মানের খাবার ইত্যাদি নানা দিকগুলি তাঁর মনকে আহত করে। তিনি দ্রুত সেগুলি দূর করার দিকে বেঁক দেন। রোগীরা যাতে পুষ্টিকর খাবার পায় তার দিকেও ছিল তীব্রনজর।

সেইসময় সেনা হাসপাতালে ফ্লোরেন্স লক্ষ করেছিলেন প্রতিদিন প্রায় শয়ে শয়ে রোগীরা মারা যাচ্ছেন। তার কোনো সঠিক লিপিবদ্ধকরণও হচ্ছে না। তিনি সে দিকটির দিকেও নজর দেন। এছাড়া রোগী মৃত্যুর সংখ্যা যাতে কম হয় সেজন্য তিনি পুরো হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কড়া ব্যবস্থা করেন। এর কিছুদিন পর তিনি লক্ষ করলেন রোগীদের মৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। হাসপাতাল যাতে রোগ নিরময় কেন্দ্র হয়ে ওঠে তার জন্য দিনরাত এক করে এমনকি নিজের পয়সা খরচ করতেও পিছুপা হননি। রাতে ঘুমিয়ে তিনি একাই লণ্ঠন হাতে মাইলের পর মাইল অনায়াসে হেঁটে ঘুরে ঘুরে অসুস্থ সৈন্যদের পর্যবেক্ষণ করতেন।

ফ্লোরেন্স লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে একটি নার্সিংস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ব্রিটিশ মহিলাদের চিকিৎসা পেশায় যোগদানের জন্য সবসময় উৎসাহিত করতেন। তিনি নার্সিং বিষয়ক বইও লিখেছেন। ১৮৫৯ সালে ‘নোটস অন নার্সিং’ নামে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল-এর বইটি সে সময় সকলের বেশ নজর কেড়ে ছিল। শুধু নার্সরাই নয় ডাক্তার থেকে সমাজের সব প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই বইটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নার্সিং-এর খুঁটিনাটি বিষয় তো ছিলই সঙ্গে চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার জন্য রোগীদের থাকার, খাওয়ার এবং পরিবেশের প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রোগীর ঘরে যাতে রোদ আসে, ঘর যাতে আর্দ্র না হয়, বিশুদ্ধ খাবার জল, পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রোগীর বেড, রোগীকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, তার ভালোভাবে দেখভাল করা, রোগীকে দেখতে আসলে রোগীর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলা প্রভৃতি সবই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের দলিল ছিল তাঁর এই বইটি। ‘নোটস অন নার্সিং’ বইটির একটি উপশিরোনাম আছে, তা হল— ‘হোয়াট ইট ইজ অ্যান্ড হোয়াট ইট ইজ নট’। কোনগুলি সেবার অপরিহার্য আর কোনগুলি না তা তিনি বেশ পরিষ্কার করে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন তাঁর বইটিতে। আসলে এককথায় বলতে গেলে ফ্লোরেন্স নার্সিং-এর অ আ ক খ (বর্ণপরিচয়) লিখে গিয়েছেন। ফ্লোরেন্স বলতেন—আমরাই একদিন উত্তরণ করবো নতুন সুস্থ রোগমুক্ত সমাজ গড়ার। তিনি আরও বলতেন, রোগীর শরীরেরই শুধু নয়, মনের খবরও রাখতে হবে যে তিনি মনেপ্রাণে কতোটা সুস্থ আছেন এবং বন্ধুর মতো রোগীর সাথে মিশতে হবে।

ফ্লোরেন্স শুধুমাত্র তাঁর দেশের নয়, বাইরের দেশগুলির জন্যও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছেন। তিনি কখনো ভারতের মাটিতে পা দেননি বটে, তবুও তিনি ভারতের চিকিৎসা শাস্ত্র, এখানকার রোগীদের জন্য জনস্বাস্থ্যমূলক নানা কাজে তৎপর হয়েছিলেন। ভারতীয় সেনবাহিনী যাতে ভালোভাবে চিকিৎসা করতে পারে, তাদের পরিবেশ যাতে অস্বাস্থ্যকর না থাকে প্রভৃতি দিকগুলিও মিস নাইটিঙ্গেল মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করতেন।

১৮৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে মিস নাইটিঙ্গেল ভারতের জনস্বাস্থ্য উন্নতির রূপরেখা রচনা করেছিলেন। তিনি স্যানিটারি কমিশন তৈরির পরিকল্পনাও করেছিলেন সেই সময়। ভারতের বিভিন্ন স্থানে হাসপাতাল, জল সরবরাহ, নিকাশি ব্যবস্থা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত মতামত দেন। ১৮৬৪ সালের ২ এপ্রিল ডা. চার্লস হ্যাথাওয়ে-কে লেখা একটি চিঠিতে ফ্লোরেন্স বলেছিলেন, কলকাতার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পরিবর্তন করা প্রয়োজন। না হলে কলকাতা আর বাসযোগ্য হয়ে উঠবে না। এছাড়া তিনি কলকাতা বন্দরে নাবিকদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যও বিস্তর পরামর্শ দিয়েছিলেন। মিস নাইটিঙ্গেলের স্যানিটারি পরিকল্পনার ফলেই ১০ বছরের মধ্যে ভারতে সেনা ব্যারাকে মৃত্যুহার নেমে এসেছিল ১৮৬৩ সালে (প্রতি হাজারে) ৬৯ থেকে ১৮৭৩ সালে ১৮-য়। ১৮৬৪ সালে ইঞ্জিনিয়ার ডগলাস গ্যালটনের সঙ্গে ভারতে সৈন্যদের আদর্শ ব্যারাকের পরিকল্পনা করেন মিস নাইটিঙ্গেল। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন মিলিটারি হাসপাতালে মহিলা নার্স নিয়োগের ব্যাপারেও তিনি সচেষ্ট এবং সফলও হয়েছিলেন। এই মহতী মহিলা সেই যুগেও যেভাবে ভারতের মানুষের জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ও মহামারি প্রতিরোধ নিয়ে ভেবেছেন, রিপোর্ট লিখেছেন, সরকারের উচ্চস্তরে বারংবার কড়া নেড়েছেন তা সত্যি কল্পনাতীত।

জীবদ্দশায় তিনি অনেক সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৮৮৩ সালে তিনি ‘রয়্যাল রেড ক্রস’ পুরস্কার পান। ১৯০৪ সালে ‘লেডি অফ গ্রেস অফ দি অর্ডার অফ সেন্ট জন (LGStJ)’ আর ঠিক তার তিন বছর পর ১৯০৭ সালে ‘অর্ডার অফ মেরিট’ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি ১৯১০ সালে লন্ডনে মারা যান।

এই আলোকবর্তিনী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে আজ আমাদের অবশ্যই স্মরণ করা উচিত। নার্সিং জিনিসটা তথা সেবা ধর্ম কাজটি যদি নাই থাকতো তাহলে আমার হয়তো সকলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তাম। নার্সদের সেবাপরায়ণ নীতি অবশ্যই জীবন বাঁচাতে বড় প্ল্যাটফর্ম। আজ করোনা মহাতঙ্কে যখন বিশ্ব দিন গুনছে তখন নার্সরাই তাঁর দেখানো পথে নিঃস্বার্থভাবে সেবা করে চলেছে। করোনা যত ছড়িয়েছে, ততই বেড়েছে নার্সদের ডিউটির সময়। কিন্তু একথা ভাবলে সত্যি অবাক লাগে যে, এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা মূর্খের মতো অজ্ঞের মতো করোনা অতিমারীকে মুক্ত করার জন্য যে সব নার্স তথা সেবিকারা নিযুক্ত তাদের আমরা ভাড়াবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করছি, এমনকি পাড়ায় ঢুকতেও বাধা দিচ্ছি। ফ্ল্যাটবাড়ির কিংবা আবাসনে নার্সদের ঢোকার পথ বন্ধ করে দিতেও পিছুপা হচ্ছি না। চোখের সামনে কিংবা খবরের কাগজে, টিভিতে যখন এসব দেখি তখন সত্যি লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। নিজেকে অজ্ঞ, ছোট মনে হয়।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নিজ হাতে সৃষ্টি করা বিজ্ঞানসম্মত নার্সিংয়ের পদক্ষেপ আজও পৃথিবীর পাথেয়। আজীবন নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, সেবাপরায়ণ তিনিই তার একমাত্র দিকদর্শন। তাঁর দেখানো পথেই পৃথিবী আজ পা বাড়িয়েছে। তাঁর দ্বিশতজন্মবার্ষিকীর শুভ লগ্নে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাই আমরা শ্রদ্ধা জানাই আজকের ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলদেরও যাঁরা নিজের জীবন বাজি রেখে অকুতোভয়ে সেবা করে চলেছেন করোনা আক্রান্ত অসংখ্য মানুষের।

আজকের আলোকবর্তিনীরূপী হাজারো অসুস্থজনের মা তথা মানবতার আশ্চর্য গরিমা তিনি।

Leave a comment