শিবানন্দ পাল
গ্রামে গ্রামে সাঁওতাল যুবকরা তাঁর দলে ভিড়তে থাকে। অবশেষে একদিন তিনি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। তাঁর মুক্তি বাহিনী অরণ্যে হঠাৎ বের হয়ে এসে ইংরেজ সৈন্যদের আক্রমণ চালিয়ে আবার অরণ্যে উধাও হয়ে যেত। এইভাবে ইংরেজ সৈন্যদের তারা অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। অবস্থা এমনি হয় যে ইংরাজ সৈন্যরা জঙ্গলের ধার দিয়ে ঘেঁষত না। শত শত সাঁওতাল বিদ্রোহী যেমন ইংরেজদের বন্দুকের গুলিতে প্রাণ দেয়, তেমনি ইংরেজরাও বাঁটুলের গুলি এবং তীরের আঘাতে প্রচণ্ড মার খায়। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই জানুয়ারি, অন্য মতে ১৭৮৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ক্লিভল্যান্ড সাহেব তিলকার বাঁটুলের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হয়ে প্রাণ হারান।
ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুতে ইংরেজ শাসক একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে এসে সাঁওতাল গ্রামগুলো তারা চষে ফেলতে থাকে। প্রায় একবছর ধরে চলে নির্মম পাশবিক অত্যাচার, তারপর তিলকা ও তাঁর অনুচরদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী।
তিলকাকে ভাগলপুরে ধরে এনে নিদারুণ চাবুক মারা হয়। তারপর ঘোড়ার পিছনে বেঁধে টানতে টানতে গোটা শহর ঘোরানো হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। তিলকা মাঝিকে যেখানে ফাঁসি দেওয়া হয় ভাগলপুর শহরের সেই জায়গায় (তিলকা চক) তিলকা মাঝির মর্মর মূর্তি এখন শোভা পায়।
ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুর পর দামিন-ই-কোহ’র ভার দেওয়া হয় আবদুল রসুল খাঁ নামে এক দেশীয় কর্মচারীর উপর। বেছে বেছে এই আবদুল রসুল খাঁকে এই দায়িত্ব কেন দেওয়া হল? ইনি কোথা থেকে এলেন বা কোনো হিন্দু জমিদার বা মহাজনকে কেন দেওয়া হয়নি, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। এই রসুল খাঁ সম্পর্কে কেউ আলোকপাত করতে চাইলে জানতে আগ্রহী।
পাহাড়িয়াদের যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল রসুল খাঁ-র সময়ে সে সব বন্ধ হয়ে গেল। অসন্তোষ আরও বেড়ে গেল। ১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ তিন বছর ধরে ইংরেজ শাসন এই অঞ্চলে অচল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু সেরকম কোনো বিশদ তথ্য নেই। ইংরেজদের মার খাওয়ার তথ্য কী আর তারা সাজিয়ে তুলে রেখে দেবে? উইলিয়াম হান্টার এই সময়কে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের কথা বলে উল্লেখ করে কিছু কথা লিখেছেন তাঁর ‘দি এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল’ গ্রন্থে। পাহাড়িয়াদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল সমতলের কৃষকরাও। (দি এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল- ডবলু ডবলু হান্টার, পৃষ্ঠা ৭৪)।
হান্টার সাহেব নিজে স্কটিশ, ১৮৬২-তে ভারতে এসেছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসক হিসেবে। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভারতের গেজেটিয়ার তৈরি করা। তাঁর উদ্যোগে ১৮৬৯ সাল থেকে গেজেটিয়ার প্রকাশ শুরু হয়। ১৮৮১ সাল অবধি নয় খন্ড প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর আরো ২৬ খণ্ড প্রকাশিত হয়। তবে লেখক হিসেবে তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই হল দ্য ইন্ডিয়ান মুসলিম। ভারতের মুসলমানদের বুঝতে হলে বইটি পড়তেই হবে।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে এখনো আমাদের তাঁর কাজের ওপর নির্ভর করতেই হয়।
১৭৮৮ সালের মাঝামাঝি থেকে ওই সময়ের সাঁওতাল বিদ্রোহীরা দামিনকো এলাকা পশ্চিম অংশে সংঘবদ্ধ হামলা চালাতে শুরু করে। ইংরেজ বণিকদের কুঠি এবং জমিদারদের কাছারি লুট হতে থাকে। বীরভূমের কালেক্টর ক্রিস্টোফার কিটিং সেনাবাহিনী নিয়োগ করেন। কিন্তু তাতে কোনও ফল হয় না। বীরভূমের কালেক্টরের ১৭৮৯ সালের ১০ জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট স্মিথকে লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায় বীরভূম জেলার ত্রিশ চল্লিশটি গ্রামের জমিদারদের শস্য গোলা এবং ইংরাজ বণিকদের কুঠি লুট হয়েছিল। এই সমস্ত এলাকা থেকে ইংরেজ শাসন একেবারে মুছে গিয়েছিল। বিদ্রোহের চেহারা দেখে ইংরেজরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হান্টার সাহেব লিখেছেন, বিদ্রোহীরা তিন থেকে চারশত লোকের এক একটি দলে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে আক্রমণ চালায়। মিঃ কিটিং নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে অনিয়মিত সৈন্যদের নিযুক্ত করেন ১৭৮৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তবু কোনও সুরাহা হয় না।
বীরভূমের কালেক্টর ১৬ অক্টোবর, ১৭৮৯ গভর্নর জেনারেলকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, “আমাদের এখানে যে সৈন্যদল আছে তা দিয়ে বিদ্রোহীদের বাধা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সৈন্যদের তুলনায় বিদ্রোহীরা অনেক বেশী শক্তিশালী, অনেক বেশী সুশৃঙ্খল ও অনেক বেশী সাহসী। আর আমাদের সৈন্যরা শৃঙ্খলাহীন, উদ্যমহীন এবং তারা লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে সহযোগিতাই বেশী পছন্দ করে।’’ (দি এনালস ওফ রুরাল বেঙ্গল- ডবলু ডবলু হান্টার, পৃষ্ঠা ৭৭)।
স্পষ্ট বোঝা যায় দেশীয় সৈন্যরা সেসময় পাহাড়িয়াদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। যার ফলে পাহাড়িয়াদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তাঁদের রণ-কৌশল উন্নত হয়েছিল, বিদ্রোহীদের সংখ্যাও বেড়েছিল। পাশাপাশি ইংরেজ শাসকের নৃশংসতাও বেড়েছিল। ‘ইংরেজ সৈন্যরা বিদ্রোহীদের বন্দি করা মাত্র হত্যা করে তাদের ছিন্ন মুণ্ডুগুলো ঝুড়ি বোঝাই করে সদর দপ্তরে পাঠাত। (সানথাল পরগণা ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার- এল এস এস ও’মালী, পৃষ্ঠা ২৯)।
১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ তিন বছর বাংলা বিহার উড়িষ্যার বিশাল অঞ্চল জুড়ে পাহাড় জঙ্গলের একটা বড় অংশে ইংরেজ শাসন অচল হয়ে পরেছিল। শুধুমাত্র সাঁওতাল পাহাড়িয়াদের যুক্ত বিদ্রোহের জন্য। পরবর্তীকালে কোনো সময়ই এরকম যা কোনোদিন শোনা যায় নি।।
উইলিয়াম হান্টার এই সময়কে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন। এখান থেকেই পাঠককে ভাবতে অনুরোধ করবো ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বিষয়টি মাথায় রাখুন।
মাথায় রাখুন সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে শিক্ষিত সমাজের মুখ ফিরিয়ে থাকা। লেখালেখি করছি এতদিন পড়ে বইপত্র ঘেঁটে। কিন্তু তখন মানুষের কাছে এসংক্রান্ত খবর পৌঁছনোর সম্ভাবনা ছিল না। তাই অজস্র গুজব, লোককাহিনী তৈরি হয়েছে। তার ভিতর থেকে প্রকৃত ইতিহাস বের করে আনা প্রথমদিকে হয়তো সহজ ছিল, এখন তা জটিল এবং কঠিন।
পাহাড়িয়াদের সঙ্গে সাঁওতালদের যৌথ সংগ্রাম ইংরেজ দমন করতে পারেনি। তাঁরা এবার কূট চালে মেতে উঠলো। তিলকা মাঝি জীবন দিয়েছে। পাহাড়ে জঙ্গলে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চলছে। ধূর্ত ইংরেজ সাঁওতালদের বসতি স্থাপন ও চাষআবাদের গঠনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করল। শোষক তখনই তার গণতন্ত্রের চেহারাটা প্রকাশ করে যখন তার সামনে বিকল্প কোনো রাস্তা থাকে না।
চৈতন্য হেমব্রম কুমার মহাশয়ের লেখা অনুসারে “রাজমহল পাহাড়ের দক্ষিণে বীরভূম ও মানভূমে দামোদর নদ পর্যন্ত পাহাড়িয়াদের মতো আদিবাসী সাঁওতালরা বহু বছর পূর্বে এসে বসবাস করেছিল; তারা হিন্দু জমিদার এবং মহাজনদের অত্যাচারে ঘুরতে ঘুরতে রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত এসেছিল। পরে পাহাড়িয়ারা সমতল জমি পছন্দ না করায় সরকার ১৭৯০ খৃষ্টাব্দ থেকে আনন্দের সঙ্গে সাঁওতালদের প্রবেশ করতে দিল। সাঁওতালরা পাহাড়ের আশেপাশে উর্বর ও সমতল জমি পেয়ে মহানন্দে বনজঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করতে লাগল।“ (সান্থাল পরগণা, সান্থাল আর পাহারিয়াকোওইয়াঃক ইতিহাস– চৈতন্য হেব্রাম কুমার, পৃষ্ঠা ৩৫)।
ফলে বিদ্রোহীদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইল। শাসকগোষ্ঠী শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। বিদ্রোহীদের সংগঠন ভেঙ্গে গেল। যারা বেঁচে ছিল, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো। কিন্তু শোষণের অবসান হয় না। সাম্রাজ্যবাদী শাসক ডাইরির পাতায় ভালো করে দাগ দিয়ে লিখে রাখে এই সমস্ত ঘটনা, ভবিষ্যতে যাতে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। নইলে দেশকে কব্জায় রাখবে কী করে? তারা তো দু-একদিনের জন্য এখানে বেড়াতে আসেনি। রাষ্ট্র একটি সংগঠিত শক্তি, বিদ্রোহীদের বিষয়টি জানা ছিল না।
দামিন-ই-কোহ’র পূর্ব দিকে সগরডাঙ্গায়, পিপড়া, আমগাছিয়ায় সাঁওতালরা প্রথম গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে। ১৮০৯ সালে দুমকা, ১৮১৮ সালে গোডডা মহকুমায় সাঁওতালদের বসবাস বিস্তৃত হয়। দেখা যাচ্ছে সাঁওতালদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে এই সময়েই স্থানীয় হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের দৃষ্টি পরে পাহাড়ি এলাকায় সাঁওতালদের গ্রামগুলোতে।
১৮৩৬-এ সরকার সাঁওতালদের বসবাসে উৎসাহ দেবার জন্য একজন স্পেশাল অফিসার নিয়োগ করে, তিনিই হলেন বিখ্যাত মিঃ পনেট বা মিঃ পন্টেট। ১৮৩৭-এ মিঃ পনেট সেই আধিকারিক। সরকারের উৎসাহ কর্মসূচির প্রথম বক্তব্য ছিল, অপরিষ্কার জমির জন্য প্রথম তিন বছর তাদের কোনো খাজনা দিতে হবে না। পরের তিন বছর নামমাত্র খাজনা ধার্য হবে। তা ছিল গ্রাম প্রতি ৩ থেকে ১০ টাকা। এরপর পরের পাঁচ বছর তাদের জমি লিজ দেওয়া হবে। মাঝিদের নিজস্ব পঞ্চায়েত গ্রামের বার্ষিক খাজনা স্থির করে দেবে।
ইতিমধ্যে দামিন-ই-কোহ’র এলাকা নির্ধারণ হয়ে গেছে। দায়িত্বে ছিলেন জন পেটি ওয়ার্ড। ১৮৩২-৩৩ সালে তিনি সারভেয়ার ক্যাপ্টেন ট্যানারকে নিয়ে দামিন-ই-কোহ’র সীমানা নির্ধারণ চূড়ান্ত করেছেন। ভাগলপুর থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে বীরভূমের ১৩৬৬.০১ বর্গমাইল জায়গা পিলার দিয়ে চিহ্নিত করা হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৫০০ বর্গমাইল শুধু সমতল, বাকী সবটাই পাহাড় অঞ্চল। আবার সমতল ৫০০ বর্গমাইলের মধ্যে আছে জঙ্গল এলাকা। মাত্র ২৫৪ বর্গমাইল ছিল আবাদযোগ্য চাষের জমি। (চলবে)
