শংকর সাহা

সেই জনপ্রিয় গানের কলি হয়তো আমাদের অনেকেরই শোনা, ‘এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে, চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব। সেই চাঁদের পাহাড় দেখতে পাব’। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। এই কথাটি যেন সর্বাংশে সত্য। একটি শিশুর মধ্যে থাকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। থাকে ভবিষ্যত সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল বীজ। শৈশবেই যেন কোনো এক শিশুর বুদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ঘটে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আজ যেন কিছুটা পাল্টে যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে যে পরিমাণে মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাবলেটের, ভিডিওগেম এই সমস্ত ইলেকট্রনিস্ক গ্যাডজেটের প্রতি আসক্তি বাড়ছে দিনে দিনে তাতে কোথাও যেন সকলকে এক প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে?
দেশজুড়ে এখন লকডাউন চলছে। লকডাউন প্রায় দেখতে দেখতে পঞ্চাশতম দিন অতিক্রম করলো অর্থাৎ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া প্রায় নিষেধ। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে মনে হয় লকডাউন আরও বাড়তে পারে। প্রায় আমরা সকলেই গৃহবন্দি আছি। বাইরে বের হলে মেনে চলছি সামাজিক দূরত্ব বা সোশ্যাল ডিসটেন্স। বন্ধ প্রায় স্কুল, কলেজ সর্বত্র। সমস্যায় পড়েছেন অনেকেই। সবচেয়ে সমস্যায় আছে বাড়ির শিশুরা। এখন স্কুল, প্রাইভেট বন্ধ হওয়ায় বাইরে পরিবেশের সাথে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্ন খেলার মাঠের সাথেও। প্রায় সমস্ত দিনই তাদের ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে। আবার এখন স্কুলে স্কুলে চালু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। ফলে দিনের বেশির ভাগ সময়ই মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাবলেটের সামনে মুখ রেখে চলছে ক্লাস। কখনো স্কুলের কখনো বা প্রাইভেটের। ফলে প্রায় তারা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে। বাড়িতেও খেলার জিনিস নিয়ে খেলবার সময় থাকছে না তাদের। কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেই অনলাইন ক্লাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইলেও বাড়ির বড়দের চাপে সেই আবারও বৈদুতিক যন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে তাদের। আজ যেন তাদের কাছে এই পৃথিবীটা ঘরের কোণে এসে পৌঁছে গেছে। যেন মনে করিয়ে দেয় এক বাংলা ব্যাণ্ডের সেই বিখ্যাত গানের লাইনগুলোকে,
“পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে
স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে
ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী”
বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে এমনই খেলার মাঠের আকর্ষণ প্রায় অনেকটাই কমেছে। স্কুল, টিউশন, ছুটির দিনে নাচ-গান-অঙ্কন শেখা সব মিলিয়ে প্রায় শিশুদের মধ্যেও আজ সময়ের প্রায় অভাব। সেই আগে একটি সময় ছিল যখন শহরে হোক বা বিশেষত বলা যায় গ্রামে ছুটির দিনে বা প্রতিদিন বিকেল করে সবাই একসাথে খেলাধুলা করতো। এতে করে শিশুদের হত দৈহিক ও মানসিক বিকাশ। আবার দেখা যেত অনেক বাড়ির বড়দের কাছে বসে সকলে নানান গল্পের বইয়ের গল্প শুনত। এতে করে পারিবারিক সান্নিধ্যে তারা আসতে পারতো বেশি। কিন্তু আজ সময়ের সাথে সাথে সেই চিত্রটি আজ অনেকটাই কমেছে। আজ খেলার মাঠ আছে কিন্তু নেই আকর্ষণ। আজকের প্রজন্মের শিশুদের সময় কেটে যায় মোবাইল, কম্পিউটার আর ভিডিওগেমে। ইলেকট্রিক এই যন্ত্রমানবগুলো আজকের প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছে চিরপরিচিত এক সঙ্গী। কিন্তু তার মাঝেও এতদিন তারা যখন স্কুলে যেত,সেখানেও স্কুলের ক্যাম্পাসে তারা খেলাধুলোর সংস্পর্শে আসতে পারত। কিন্তু লকডাউনে আজ সব বন্ধ। ফলে ঘরের চার দেওয়ালে প্রায় বন্দি এ প্রজন্মের শিশুরা। এখন অনলাইন ক্লাস, অন্য সময়ে মোবাইলে ভিডিওগেম যেন ক্রমশ তারা মানসিক দিক থেকেও পিছিয়ে আসছে ।
এতে শারীরিক ও মানসিক সব দিক থেকেই প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপরে। এমতাবস্থায় বাড়ির বড়দেরই আরও যত্নশীল হতে হবে শিশুদের প্রতি। তাদের সাথে মিশতে হবে, গল্প শোনাতে হবে। শিশুদের মনের সুকুমার চিত্তগুলোকে জাগিয়ে রাখতে হবে এই লকডাউনের সময়েও। লকডাউনের মাঝেও বাড়ির শিশুরা সকলেই ভালো থাকে এ দায় আমার, আপনার ও সকলের। কারণ, ‘আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ’।
