দেখতে দেখতে ৪৭-এ ‘সায়ক’

অনামিকা ভট্টাচার্য

আর কিছুদিনের মধ্যেই অর্থাৎ ২ ডিসেম্বর ২০২০ সায়ক নাট্যগোষ্ঠী ৪৭ বছরে পদার্পণ করবে। প্রতি বছরের মতো এবছর ও দলের সকল সদস্য সদস্যারা দলের জন্মদিন উদযাপনের উদ্দেশ্যে বহুদিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিল, কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে যায়, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সবকিছুই। কিন্তু তবু তারা থামেননি। সব সমস্যার কথা মাথায় রেখে এবছর নতুনভাবে দলের জন্মদিন পালনে জন্য তৈরি হচ্ছেন দলের সদস্যরা, কিছুদিন আগে এ দলের কর্ণধার মেঘনাদ ভট্টাচার্য এর নাট্যজীবনে ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে তার উদযাপন ও অন্যরকম ভাবে করা হয়, এ বছর দলের জন্মদিন নতুন ভাবে নতুন সাজে সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে ঠিক কেমন ভাবে পালন হয় তাই দেখার।
এগারো জন বন্ধু মেঘনাদ ভট্টাচার্য, সুজয় ভট্টাচার্য, পার্থ গোস্বামী, ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, মলয় দাস, সুভাষ বিশ্বাস, প্রদীপ সুর, ভুবন ব্যানার্জি প্রমুখেরা মিলে ১৯৭৩ সালে দলটি তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে মেঘনাদ ভট্টাচার্য একজন যিনি আজও এই দলের বটগাছ হয়ে সবকিছু আগলে রেখেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলেছে শুধু রয়ে গেছেন এ দলের প্রাণপুরুষ। ১৯৭৯ সালে ‘দুই হুজুরের গপ্পো তার প্রথম পরিচালনা যার সাধুবাদ আজও দর্শকদের মুখে শোনা যায়। তারপর একে একে ‘বাসভূমি’, ’সাধুসঙ্ঘ’, ’সোনার মাথাওয়ালা মানুষ’, ’যদিও স্বপ্ন’, ’জ্ঞানবৃক্ষের ফল’, ’অ আ ক খ’, ’স্বর্নচাপা’, ’দায়বদ্ধ’, ’সাঝঁবেলা’, ’বধূতন্ত্র’, ’দিলদার’, ’দৌড়নামা’, ’পিঙ্কি বুলি’, ’ধ্রুবতারা’, ’পাসিং শো’, ’দামিনী হে’, ’প্রেমকথা’, ’পুনরুত্থান’, ’ভালো লোক’ এই সমস্ত নাটকের হাত ধরে দলের সকলকে সঙ্গে নিয়ে এতগুলো বছর একা মেঘনাদ ভট্টাচার্য কান্ডারি হয়ে এগিয়ে চলেছেন,যার কাছে সকল শিষ্য শিষ্যারা সমান যিনি মাটির প্রতিমা গড়ার ন্যায় প্রতিবার প্রতিটি নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগে প্রত্যেকেই নতুন ভাবে গড়েন।
এই দলের সদস্য সদস্যারা সত্যি এক একজন মাটির প্রতিমাই বটে, কোনো প্রবীণরা নতুনদের কখনো খারাপ কথা বলেন না, প্রবঞ্চনা করেন না বরঞ্চ প্রত্যেকে একে অপরের ছোট ছোট সাফল্য গুলো কে সকলে মিলে ভাগ করে নেন একান্নবর্তি পরিবারের মতো, সকলে সকলের সঙ্গে থাকেন, এই দলেরই সর্বকনিষ্ঠা সদস্য সদস্যা হলাম আমি। সায়কের সঙ্গে আমার পথ চলা শুরু যখন আমার বছর চারেক বয়স। তখন থেকে এই পর্যন্ত আমি দেখে আসছি অনেক কিছুই। নাটকের ধারার পরিবর্তন, সেট, লাইটের পরিবর্তন, অভিনয় রীতির পরিবর্তন, আর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার রীতি।
কিন্তু দলের আদর্শের কোনো পরিবর্তন হয়নি,প্রত্যেক সদস্যই দলের আদর্শে মেনে চলেন এবং নতুন দের ও সেই এক আদর্শে চলা শেখান।
এখনো দলের প্রবীণ মৃত সদস্যদের স্মরণ করে তাদের ছবিতে মালা ধূপ দেখানো হয় প্রত্যেক মঞ্চাভিনয় এর আগে।
সায়ক নাট্যগোষ্ঠী বাংলা থিয়েটারের দর্শকদের উপহার দিয়েছে একাধিক ভালো নাটক, যার মধ্যে দায়বদ্ধ, বাসভূমি, দুই হুজুরের গপ্পো, কর্নাবতি, বধূতন্ত্র, জ্ঞানবৃক্ষের ফল, দিলদার, সাঝঁবেলা, পিঙ্কি বুলি প্রভৃতি নাটকগুলি ১০০ রজনী অতিক্রম করছে দর্শকদের ভালোবাসায়। ‘দায়বদ্ধ’ নাটকটি সেই সময় বাংলা থিয়েটারে এক আমূল পরিবর্তন আনে, গগন এবং সীতার সংসারের কাহিনি দেখতে দলে দলে মানুষ ভিড় করতেন হলের দরজায়।
গগনের চরিত্র মেঘনাদ ভট্টাচার্য স্বয়ং এবং সেই সময় ঝিনুকের চরিত্রে অভিনয় করেন সনামধন্য অভিনেত্রী মৌসুমি সাহা এবং সীতার চরিত্রে বেবি সরকার যাদের অভিনয় বহুপ্রশংসিত হয়।বর্তমানে সীতার চরিত্রে অভিনয় করেন রুনা মুখোপাধ্যায় যার অভিনয়ের প্রশংসা প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়েই চলেছে।ঝিনুকের চরিত্রে মৌসুমি সাহার পর অনেকেই অভিনয় করেন যাদের মধ্যে ইন্দ্রজিতা চক্রবর্তী আর তুহিনা চক্রবর্তীর নাম মনে পরে যায় বর্তমানে এই চরিত্রে অভিনয় করছেন রিমঝিম ঘোষ।
সায়কের চলতি প্রযোজনা-লুইসি পিরানদেল্লো অনুপ্রাণিত চন্দন সেন রচিত মেঘনাদ ভট্টাচার্য এর নির্দেশিত নাটক ‘ভালো লোক’ যার জন্মলগ্ন ২৭মার্চ ২০১৯। নাটকটিতে অভিনয় করেছেন- মেঘনাদ ভট্টাচার্য, রুনা মুখোপাধ্যায়, কথাকলি, আশিস ঘোষ, প্রদীপ দাস, অজয় শঙ্কর ব্যানার্জি, ধুর্জটি দে, সুখরঞ্জন ভট্টাচার্য, শম্পা সেনা, ঝর্ণা মান্না, জয়ন্ত দাস-সহ আরো অনেকে। এই নাটকে আমি একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাই এবং তা সাধ্য মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা করি।
নাটকটির আলো করেছেন-সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, রূপসজ্জা-পঞ্চানন মান্না, মঞ্চ-সৌমিক পিয়ালি, সঙ্গীত পরিচালক- গৌতম ঘোষ।


আপাদমস্তক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে এই নাটক, এ নাটকের শেষে দর্শক এই সত্যে উপনীত হয় যে, ‘ যার সব ভালো তার শেষ ভালো’ এ নাটকে বন্ধুত্বের কথা, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অটুট বিশ্বাসের কথা, মেয়ের প্রতি বাবার স্নেহ, বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার কথা বলা আছে। এই সবকিছুর জন্যই মঞ্চাভিনয়ের শেষে প্রতিবার দর্শকদের আনন্দঅশ্রুর সাক্ষী থেকেছি আমরা। ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ একাডেমি তে সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় এই নাটকটির শেষ মঞ্চাভিনয় হয়, তারপরেই থমকে যায় সমস্ত পৃথিবী। বাতিল করা হয় দলের নতুন নাটকের প্রথম মঞ্চাভিনয় সহ ‘ভালো লোক’ নাটকের অনেক গুলো অভিনয়, এ ছাড়াও সায়কের জনপ্রিয় নাটক দামিনী হে, প্রেমকথা নাটকের ও অভিনয় বাতিল হয়।
কারুর জানা নেই আবার কবে সবকিছু স্বাভাবিক হবে, কবে আমরা ফিরতে পারবো নিজেদের জায়গায় এই অনিশ্চয়তা ঘিরে ফেলেছে আমাদের সকলকে।তবু থেমে নেই সায়ক নাট্যগোষ্ঠী থেমে নেই সয়ং মেঘনাদ ভট্টাচার্য। দলের জন্মদিনের কথা মাথায় রেখে ধীরে ধীরে নিজেদের মহলাকক্ষটাকে আবার ভরিয়ে তোলার চেষ্টায় আছে সায়ক। মেঘনাদ ভট্টাচার্য এর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে দলের নতুন নাটক যা এখনো মঞ্চস্থ করা সম্ভব হয়নি খুব শিগগিরই তা অন্যরকম ভাবে দর্শকদের কাছে আসবে। সকল সদস্য কে সঙ্গে নিয়ে আবারোএকা মেঘনাদ ভট্টাচার্য নাটকের তরী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন।

Leave a comment