বিশেষ প্রতিনিধি
গুলি চালিয়ে নিজের পাড়ায় আট জন পুলিশকর্মীকে খুন করার পর ৩ জুলাই উত্তরপ্রদেশের কানপুরের চৌবেপুর থানা এলাকার কুখ্যাত দুষ্কৃতী বিকাশ দুবে দলবল-সহ গা-ঢাকা দেয়। উত্তরপ্রদেশ পুলিশ গরুখোঁজা করার পরেও এই বিকাশ দুবের খোঁজ ছয়দিন ধরে পায়নি। তারপর ৭ জুলাই তাঁর খোঁজ মেলে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে, সেখানকার মহাকাল মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় বিকাশ। তবে এই ঘটনা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বিকাশের একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর পরেই সারেন্ডার করে বলে অনেকে মনে করছেন। তার রাজ্যের পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে মধ্যপ্রদেশে পালিয়ে এসে বিকাশ এত সহজে ধরা পড়ে যাবে এটা বিশ্বাস করা শক্ত। তার পরের ঘটনা হিন্দি ছবির স্ক্রিপ্ট-এর মতো। ধরা পড়ার দিনই বিকালে মধ্যপ্রদেশ পুলিশ বিকাশ-কে তুলে দেয় উত্তরপ্রদেশের পুলিশের হাতে। তাকে নিয়ে সড়কপথে পুলিশের কনভয় উজ্জয়িনী থেকে রওনা দেয় কানপুরের দিকে। এই কনভয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিকরাও ছিলেন। কিন্তু কানপুরে ঢোকার মুখে টোল প্লাজার কাছে পুলিশ বিকাশ দুবের কনভয়কে যেতে দিলেও সমস্ত সংবাদমাধ্যমের গাড়ি আটকে দেয়। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আটকে পড়া সাংবাদিকরা জানতে পারেন বিকাশ দুবেরা যে গাড়িতে যাচ্ছিল, সেটি গরুর পালকে পাশ কাটাতে গিয়ে নাকি উল্টে যায়। গাড়ির মধ্যে পুলিশকর্মীরা আহত হন। এই সময় বিকাশ দুবে নাকি এক পুলিশকর্মীর রিভলবার কেড়ে নিয়ে পালাতে চেষ্টা করেন। পুলিশের দিকে সে নাকি গুলিও ছোড়ে এই অবস্থায় পুলিশ পাল্টা গুলি চালাতে তিনটি গুলি লাগে বিকাশের বুকে আর এক লাগে হাতে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
বিকাশ দুবের এই মৃত্যুর ঘটনা প্রসঙ্গে উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব ও মায়াবতী, কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা বঢ়রা গান্ধি এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসও সমালোচনায় মুখর হয়েছে। অখিলেশ যাদব বলেছেন, গাড়িটা ওল্টায়নি, বিকাশ দুবে কাণ্ড ফাঁস হলে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার উল্টে যেত। প্রিয়াঙ্কা এবং মায়াবতী প্রায় একই সুরে এই ঘটনাকে পুলিশি এনকাউন্টার বলে ব্যাখ্যা করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেছেন, উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টাররাজ চলছে। তাতে মৃত্যু হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার।
প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশে পুলিশি এনকাউন্টার নতুন কিছু না। বিকাশ দুবের মৃত্যুকাণ্ডের আগেই তার দলের পাঁচ জন পুলিশের গুলিতে মারা গেছে সম্প্রতি। এদের মধ্যে রয়েছে তার মামা প্রেম প্রকাশ দুবে, অতুল দুবে, অমর দুবে, প্রভাত মিশ্র এবং বৌবা দুবে এরা সকলেই কয়েক দিনের মধ্যে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন, অপরাধীদের তিনি পূজা আরতি করবেন না। হয় তারা উত্তরপ্রদেশ ছাড়ুক নইলে এমন জায়গায় পাঠাবো যেখানে কেউ যেতে চায় না। বস্তুত গত ১৪ মাসের হিসেবে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ৫১৭৮টি সংঘর্ষ বা এনকাউন্টার চালিয়েছে বলে সমালোচিত হয়েছে। তাতে মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জনের। জখম আরও ১৮৫ জন। মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকেও একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে উত্তরপ্রদেশকে। তবু অপরাধী ধরে বিচার ব্যবস্থার সামনে হাজির করানোর বদলে এনকাউন্টার অব্যাহত।
রাজনৈতিক মহলের খবর বিকাশকে মেরে তার মুখ বন্ধ করা না গেলে শাসকদল বিজেপি ছাড়াও সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং রাজ্য পুলিশের হর্তাকর্তা অনেকের সঙ্গেই অপরাধ জগতের যোগাযোগটা প্রকাশ পেয়ে যেত তাই এনকাউন্টার। দুর্ঘটনা এবং বিকাশের পালানোর ঘটনা যতই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ প্রচার করুক, বেশ কিছু তথ্য অন্যরকম সন্দেহ করতে বাধ্য করছে— ১) বিকাশ যে গাড়িতে ছিল টাটা সাফারি। কিন্তু যে গাড়িটি উল্টেছে সেটি মহিন্দ্রা টিইউভি-৩০০। ২) পালাতে চেষ্টা করলে বিকাশের বুকে গুলি লাগালো কেন! গুলি পিঠে লাগার কথা ছিল। ৩) ঝড়বৃষ্টির সময় কাদামাখা পথে পালাতে চেষ্টা করলেও বিকাশের জামা কাপড়ে কোনো কাদামাটির দাগ নেই কেন? ৪) দুর্ঘটনা, পালানো, ঝড়বৃষ্টি, গুলি চালানো— এত কিছুর পরও বিকাশের মুখে মাস্কটা রইল কি করে? ৫) কানপুরে টোল প্লাজায় সমস্ত সংবাদমাধ্যমের গাড়িকে আটকে দেওয়া হল কেন?
একটি ভিডিও বার্তায় মধ্যপ্রদেশের এক পুলিশকর্তাকে বলতে শোনা গেছে বিকাশ দুবে আশা করি কানপুর পৌঁছোবে না। ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে। এই সমস্ত প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার উত্তর আগামী দিনে বিচার ব্যবস্থাকে দঢ় রাখতে প্রশাসনকে দিতেই হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভকে অস্বীকার করার দায়ে কুখ্যাত অপরাধীদের মতোই পাপের দায়ভার বইতে হবে উত্তরপ্রদেশ সরকারকেও।
