সাঁওতাল বিদ্রোহ ৪

শিবানন্দ পাল

বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা তখন একটি প্রদেশ, ভাগলপুর একটি ডিভিশন।মিঃ অলিভার ব্রাউন ডিভিশনের কমিশনার, তাঁর অবসরের সময় হয়ে এসেছিল। তাঁরই অধীনে কাজ করতেন দামিনকো-র সুপারিনটেনডেন্ট মিঃ জেমস পনেট বা পন্টেট। মিঃ পনেটকে ব্রাউনের সুপারিশে ১৮৫৪ সালের ৩ নভেম্বর মুন্সেফ পদে নিযুক্ত করা হয়।কিন্তু পনেট এই পদে যোগদান করেন ২০ মার্চ, ১৮৫৫। পনেট একই জায়গায় কাজ করছেন অথচ প্রায় পাঁচ মাস পরে মুন্সেফ পদে কেন যোগদান করেন জানা যায় না। কারণ কমিশনার ব্রাউন চেয়েছিলেন পনেট তাড়াতাড়ি কাজে যোগ দিন। পনেট দামিনকোর দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে ১৮৩৭ থেকে সেখানে কাজ করছেন। মুন্সেফ ক্ষমতা তাঁকে অধিকতর ক্ষমতাশালী করবে অপরদিকে মহাজনদের বাড়িতে ডাকাতির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। মিঃ ব্রাউন বুঝতে পারছিলেন সাঁওতালদের ক্ষোভ বাড়ছে।
জেমস পনেট বা পন্টেট-র কাজ ছিল সাঁওতালদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা। আর এই কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন দিঘি থানার দারোগা মহেশলাল দত্ত। দারোগা মহেশলাল দত্তর খুব একটা সুখ্যাতি ছিল বলে জানা যায় না। কুখ্যাত বলেই পরিচিতি ছিলেন।তিনিই সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল অনুঘটক। আর পনেট সাহেবকে সাঁওতালরা বলতো পাল্টিন সাহেব। কেন বলতেন? তিনি কী মাঝে মাঝে পাল্টি খেতে অভ্যস্ত ছিলেন! তাঁর লেখা নথিগুলোতে যে মনোভাব ফুটে ওঠে তা তাঁর কাজের সাথে মেলে না। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাওড়া রানীগঞ্জ রেলপথ চালু হয় ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৫৫। ফলে রানীগঞ্জ থেকে সিউরি হয়ে স্থলপথে দুমকা, লিটিপাড়া, পাকুড় বা বারহেট রাজমহল যোগাযোগ দ্রুত ও সহজ হয়ে যায়। তাহলে কী কোম্পানি সরকারের ওপর মহলে সাঁওতালদের বিরুদ্ধে কোনও চক্রান্ত হয়েছিল? সেজন্য‌ই ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করা?
সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। ১৮৫৫-র সাঁওতাল বিদ্রোহের ৭০ বছর আগে এই দামিন-ই-কোহ’তেই সাঁওতালরা প্রথম ইংরেজদের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেছিল। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা ও বিহারের ক্ষমতা দখল করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানির কর্মচারীদের একটা বড়ো অংশ ছিল অর্থলোভী। বাংলা ও বিহার দুই প্রদেশের ধন সম্পদ অবাধে লুঠ করতে থাকলেও তারা বাংলা বিহারের অরণ্য অঞ্চলে খুব একটা ঘেঁষত না। বিহার ও বাংলার অরণ্য অঞ্চল ছিল রাজমহল থেকে শুরু করে পশ্চিমে ভাগলপুর, মুঙ্গের হয়ে হাজারিবাগের সীমা পর্যন্ত। পুবে বীরভুম, বর্ধমান; দক্ষিণে বাঁকুড়া মেদিনীপুর হয়ে উড়িষ্যার ময়ুরভঞ্জ এলাকা পর্যন্ত। এই অরণ্য ছিল ছোট ছোট পাহাড় ও শ্বাপদ-সঙ্কুল গভীর জঙ্গলে ভরা। জঙ্গলে শাল, শিমূল, পলাশ, আম, জাম, কাঁঠাল, মহুয়া প্রভৃতির গাছ ছিল। ছিল কাঁটা গাছের ভয়ঙ্কর ঝোপ। দুর্ভেদ্য এই জঙ্গল ছিল বাঘ, ভালুক, হাতি প্রভৃতি বন্য জন্তুর আবাসস্থল। পাঠান ও মোগল সৈন্যরাও বাংলায় আক্রমণ হানতে এই পথে যাওয়া আসা করলেও এই বিশাল জঙ্গল পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী পাহাড়িয়া মানুষদের খুব একটা ঘাঁটাত না। পাহাড়িয়ারা তাঁদের শিকার ও আদিম প্রথায় চাষ-আবাদ নিয়েই সুখে ছিল। কোনোদিন তারা কারো বশ্যতায় থাকেনি। নিজেদের সামাজিক কৌম্য বন্ধনে সুখী ছিল। একদা কোনও এক সময়ে গুপ্ত যুগ এবং তার পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে আঞ্চলিক ছোট ছোট রাজ্য ছিল। আঞ্চলিক স্থানীয় রাজারা শাসন করতেন। রাজমহল এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল বলে উল্লেখযোগ্য নয়। ঐতিহাসিক কারণে রাজমহল গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে কনৌজ রাজ হর্ষবর্ধন, কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মা বিখ্যাত চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙ একত্রে মিলিত হয়েছিলেন। সে অন্য গল্প।
নবাবি আমলে হিন্দু মুসলমান জমিদারেরা রাজমহল পাহাড়ের আশেপাশে কিছু কিছু জমি দখল করেছিল, কিন্তু অরণ্যভূমিতে তারাও প্রবেশ করেনি। স্বাধীনচেতা অরণ্যভূমির সন্তানরা কাউকে তাদের এলাকায় প্রবেশ করতে দিত না। জমিদাররা লোকজন নিয়ে অরণ্যে প্রবেশের চেষ্টা করলে তারা আরও গভীর জঙ্গলে সরে যেত, নয়ত বনের ভিতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুড়ে আক্রমণ করত। জমিদারের লোকজনদের সাধ্য ছিল না সেই আক্রমণ প্রতিরোধ করে। এজন্য প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় আদিবাসী সর্দারদের নেমন্তন্ন করে পাগড়ি, পোশাক, ও নানা জিনিস উপহার দেওয়ার একটা সামাজিক নিয়ম চালু হয়েছিল। এই ব্যবস্থা এখনও সাঁওতাল পরগণার আশেপাশে অনেক জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়।
দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার প্রথম দিকেই সাঁওতালরা নানা রঙের পোষাকে সজ্জিত হয়ে নাচতে নাচতে অনেক শহরেই সিধে নিতে আসে। বর্ধমান শহরেও এরকম একটি পরম্পরা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজমহল এলাকার দেওয়ানি নেওয়ার পরই আদিবাসীদের দমন করার কর্মসূচি নেয়। বিশেষভাবে সাঁওতাল পরগণার পাহাড়িয়াদের। তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় আঘাত পরে।
দামিনকো অঞ্চল তখনও সাঁওতাল পরগণা নাম হয়নি। সাঁওতালদের তুলনায় পাহাড়িয়ারা ছিল বুনো এবং হিংস্র প্রকৃতির। সাধারণত সাঁওতালদের বাস পাহাড়ের নীচে সমতলে, পাহাড়িয়াদের বাস পাহাড়ের ওপরে। সাঁওতালদের তুলনায় এদের গায়ের রঙ কম কালো। উচ্চতা কম অর্থাৎ বাঁটুল বাঁটুল চেহারা। দেখলেই বোঝা যায় শরীরে অসম্ভব ক্ষমতা ধরে। পাহাড়ের ওপরে ছোট ছোট ঝুপড়িতে তাদের বাস। শীতের আগে তারা নীচে নেমে আসত, সমতলের ফসল লুঠ করত। কেউ বাধা দিলে মারমূর্তিতে তাকে ধ্বংস করত। কোম্পানি আমলের রাজস্ব আদায়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী শেরউইল এদের ‘পর্বত অরণ্যচারী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন, “পাশাপাশি জেলাগুলির কাছে এই পাহাড়িয়ারা ছিল মূর্তিমান বিভীষিকা ; এই জেলাগুলির অধিবাসীদের কাছ থেকে তারা জোর করে অর্থ আদায় করত। যখন অর্থ পেত না তখনই তারা সশস্ত্র দলে সংঘটিত হত এবং বাঁশের তীর-ধনুক নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসত। যে কেউ তাদের ডাকাতিতে বাধা দিত তাকেই তারা হত্যা করত এবং কাছাকাছি ও দূরে লুটতরাজ করে দুর্ভেদ্য জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেত।“ (ক্যাপ্টেন শেরউইল’স রিপোর্ট, পৃষ্ঠা ২৬)।
১৭৭২ সালে ক্যাপ্টেন ব্রক একদল সিপাহী নিয়ে পাহাড়িয়াদের দমন করতে গেছিলেন। পাহাড়িয়ারা অধিকাংশ সিপাহীকে জঙ্গলের আড়াল থেকে তীর ছুঁড়ে হত্যা করেছিল। ব্রককে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। পরের বছর অগসটাস ক্লিভল্যান্ড রাজমহলের সুপারিন্টেনডেন্ট হয়ে আসেন। ১৭৭৯ সালে তিনি ভাগলপুরের কালেক্টর পদে নিযুক্ত হন। পাহাড়িয়াদের তিনি বোঝাতে সফল হলেন যে তাদের অভাব অভিযোগ দূর করার দায়িত্ব তিনি নেবেন। সর্দারদের জন্য মাসিক দশ টাকা, আর মাঝিদের জন্যে দু’টাকা বেতন ও তাদের জন্যে নীল জামা, লাল পাগড়ির ব্যবস্থা করলেন। এছাড়াও বহু পাহাড়িয়া যুবককে তিনি সিপাহীতে নিয়োগ করলেন।
কুমার চৈতন্য হেব্রাম-এর লেখা থেকে জানা যায় ১৭৮০ সালে এরকম চারশো পাহাড়িয়াকে সিপাহীতে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তারা সর্দারদের অধীনে কাজ করত। মূলত কোম্পানি সরকার অরণ্য প্রদেশে এদের দিয়েই শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করতে চেয়েছিল। পরীক্ষিত হওয়ার পর ভাগল্পুরে এদের কোনও একজন লেফটেন্যান্ট বা ক্যাপ্টেনের অধীনে বহাল করা হতো। (সান্থাল পরগণা, সান্থাল আর পাহারিয়াকোওইয়াঃক ইতিহাস- চৈতন্য হেব্রাম কুমার, পৃষ্ঠা ৩১)।
বন্ধুদের স্মরণে রাখতে বলি, সাঁওতালদের তুলনায় পাহাড়িয়ারা এখনও পশ্চাৎপদ শ্রেণি। অথচ জানা যাচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদলে এদের নেওয়া হয়েছিল।
মাছের তেলে মাছ ভাজা কৌশলে ক্লিভল্যান্ড অল্প দিনের মধ্যেই পাহাড়িয়াদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পাহাড়িয়ারা তাঁকে
‘চিলিমিলি সাহেব’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। ক্লিভল্যান্ড বছরে দু’বার পাহাড়িয়া সর্দার এবং মাঝিদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। তিনি নিজেই সেই বৈঠক পরিচালনা করতেন। এই ক্লিভল্যান্ড-এর পরামর্শে কোম্পানি সরকার পাহাড়িয়াদের জন্যে বিশেষ অঞ্চল ‘দামিন-ই-কোহ’-র পরিসীমা নির্ধারণ এবং পরিকল্পনা করে। কিন্তু পাহাড়িয়ারা শেষ পর্যন্ত তাঁর বশে থাকে না।
একই প্রতিক্রিয়া সাঁওতালদের। তারা অরণ্যভূমির সন্তান। অরণ্যে স্বাধীনভাবে এতদিন জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। মোগলযুগেও কেউ তাদের ঘাঁটায় নি। তাঁদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়নি। কোম্পানির লোকজন তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়। জমির ওপরে খাজনা দেওয়াকে তারা ঘোরতর অন্যায় মনে করল। শুরু হল তাদের ওপরে ইংরাজ শাসকের অত্যাচার-উৎপীড়ন। কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাদের জীবন অসহনীয় করে তোলে। তাদেরকে ধরে নিয়ে এসে ভাগলপুরের জেলে পোরা হতে থাকে। এই রকম একটা সময় বিদেশী শাসকের বর্বরসুলভ এই মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামনে এসে দাঁড়ান বাবা তিলকা মাঝি। তাঁর আসল নাম তিলকা মুরমু। এখনও কেউ কেউ বলেন তিনি সাঁওতাল পরগণার পাকুড় অঞ্চলের লিটিপাড়া সংলগ্ন এলাকার মানুষ ছিলেন। তাঁর চোখ খুব বড়ো বড়ো ছিল বলে শৈশবে নাম রাখা হয় তিলকা। তিলকা ছিলেন অসীম সাহসী আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। সাঁওতালদের নিয়ে তিনি নিজের একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। বাহিনীর সবাইকে তীর-ধনুক, টাঙ্গি-বল্লম ও বাঁটুল চালনা শিক্ষা দিতে লাগলেন। নিজেও ছিলেন তীর ও বাঁটুল চালনায় পারদর্শী। (চলবে)

Leave a comment