
মিস্টু আইচ রায়
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বিভাবন’। প্রায় বিগত ২৪ বছর ধরে মূলত অন্তরঙ্গ থিয়েটার নিয়ে চর্চা করছেন বিভাবন। নাট্য প্রযোজনার পাশাপাশি তারা বিভিন্ন সময়ে আয়োজন করে এসেছেন পত্রিকা প্রকাশ, নাট্য বক্তৃতা, নাট্য আলোচনা, নাট্য উৎসব ও নাট্য কর্মশালা। বর্তমানে এই কোভিড ১৯ ভাইরাসের প্রভাবে যখন শিল্পীরা গৃহবন্দি, তখন তারা আয়োজন করেছেন এক অনলাইন নাট্যকর্মশালার। সপ্তাহে একদিন করে জুন মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত চলবে এই কর্মশালার প্রথম পর্যায়। শুধুমাত্র এই দলের সদস্যরা নন, বিভিন্ন জেলার থেকে ও সুদূর বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারীরা যোগ দিয়েছেন এই অনলাইন কর্মশালায়।
বিভাবন নাট্যদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং নির্দেশক সুপ্রিয় সমাজদার-এর পরিচালনায় ও অভিনেত্রী সুচেতনা দে-র ভাবনায় এই নাট্যকর্মশালার নামকরণ হয়েছে Dialogue in Dark (অন্ধকারের সংলাপ)। আসুন, আজ আমরা তাদের এই নতুন পদ্ধতির নাট্য কর্মশালা সম্পর্কে কিছু জেনে নিই। এই কর্মশালায় এখনো পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন নাট্যকর্মী এই অনলাইন পদ্ধতির দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ করছেন। ইতিমধ্যে পাঁচটি ক্লাস সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে মূলত শেখানো হয়েছে একজন অভিনেতা ও অভিনেত্রী হওয়ার জন্য কি ধরনের শিক্ষা অর্জন করতে হয়। সুচেতনা দে শেখাচ্ছেন ভরত মুনি রচিত নাট্যশাস্ত্র থেকে বাচিক স্তোত্রম। যা প্রত্যহ অভ্যেস করলে সংলাপের ব্যবহারের সময় জড়তা অনেকটা বিলীন হবে। এর সঙ্গে সুচেতনা এটাও শেখাচ্ছেন, কিভাবে নাভির স্বর উচ্চারণ করা হয় এবং কিভাবে খাদে শব্দের ব্যবহার করে শব্দের সামঞ্জস্যতা আনা যায়। তিনি আরও শেখাচ্ছেন শব্দের পরিবর্তন, শব্দের সামঞ্জস্যতা, নব রসের বিভাগ, রসের রঙ, শব্দের উচ্চারণ, অভিব্যক্তি. এই সমস্ত কিছু দিয়েই শিক্ষিত হন একজন নাট্যকর্মী। সুপ্রিয় সমাজদার এই শিক্ষায় সাহায্য করেছেন তার নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক মুক্ত নাট্য পদ্ধতির মধ্য দিয়ে, তিনি শেখাচ্ছেন থিয়েটার যতটা না বাইরের তার থেকে বেশি ভিতরের, নিজের সাথে নিজের সংলাপ তৈরি, নিজেকে দেখা, নিজের মুভমেন্টকে বোঝার চেষ্টা।
বিশেষ কিছু নাট্য নিদেশক এই কর্মশালায় আসছেন, গত ১৮ জুন এসেছিলেন ইতালি দেশের মার্কো বালবি ডিপলমা, যিনি বিশিষ্ট অভিনেত্রী রেনে মেরেকা প্রধান সহযোগী হিসেবে বর্তমানে কাজ করছেন। (রেনা মিরেকা বিশিষ্ট নির্দেশক জের্জি গ্রোটভস্কির সাথে তার ল্যাবরোটারি থিয়েটারে ১৯৫৮/৫৯ সাল অভিনেত্রী হিসেবে বিভিন্ন প্রযোজনার থেকে যুক্ত ছিলেন পরে তিনি প্যারা থিয়েটার নিয়ে কাজ শুরু করেন ১৯৭৬/৭৭ সাল থেকে) মার্কো তার রেনার সাথে কাজ করার উপলব্ধি বিনিময় করেন যেখানে এদেশের বাইরেও বাংলাদেশ, ইতালি, পোল্যান্ড থেকেও এই কর্মশালায় নাট্যকর্মীরা যোগদান করেছিলেন।
জানা গেল এই বিশেষ ক্লাসে আগামীতে আরো বিশিষ্ট অতিথিরা ক্লাস করাবেন। যাদের মধ্যে আছেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী দ্বিতীপ্রিয়া সরকার, বাংলাদেশের নাট্য ব্যক্তিত্ব জাহিদ রিপন ও স্পেনের বিশিষ্ঠ নৃত্যশিল্পী মনিকা দে লা ফুয়েন্টে এবং অন্যান্য বিশিষ্ট মানুষরা।
বিভাবন তাদের এই নাট্য কর্মশালার আয়োজনের মধ্য দিয়ে নাট্যকর্মীদের এক বিশাল সুযোগ ও উৎসাহের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এবং অন্তরঙ্গ থিয়েটারকে এক নতুন ভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন। নাট্যকর্মীদের জন্য এই কর্মশালা সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই। তবে একটি অনুদান রাখা হয়েছে যা নির্দিষ্ট নয়, এর থেকে তারা আগামীতে দুস্থ শিল্পীদের পাশে সহযোগিতা করার চেষ্টা করবেন বলে জানা গেল।
প্রশ্ন হল কর্মশালা থেকে নাট্যকর্মীরা কতটা উপকৃত? এর উত্তরে বিভাবনের সদস্যরা ও অন্যান্যরা বলেছেন, তাঁরা ভীষণ ভাবে উপকৃত হচ্ছেন এই কর্মশালা থেকে। তাঁরা তাদের ভাবনাকে আরো বেশি প্রসারিত করতে পারছেন। এই লকডাউনের সময় যতটা অসহায় তারা নিজেদের ভেবেছিলেন তার থেকে বেরিয়ে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার কথা তারা ভাবতে পারছেন এবং বহু ভুলে যাওয়া মৌলিক জ্ঞান তারা আবার নতুন করে সাধন করতে পারছেন। তাদের কাছে ‘বিভাবন’ এখন অন্তরঙ্গ থিয়েটারকে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে বলা যায়। প্রসঙ্গত, বিভাবন গত বছর থেকে শুরু করেছে অন্তরঙ্গ নাট্য চর্চা কেন্দ্র, জোড়াবাগানে। যেখানে তারা এই অন্তরঙ্গ থিয়েটারের বিভিন্ন দিক নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে থাকেন। এই লকডাউন উঠে গেলে তারা শুরু করবেন তাদের নিয়মিত কাজ।
অবশ্য এতকিছুর পরেও একটা জিজ্ঞাসা থেকেই যায় অনলাইন নাট্যকর্মশালা কি আদৌ থিয়েটার? এই নাট্যগোষ্ঠী কাজ দেখার পর এটুকু বলাই যায়, অনলাইন কেন ফোন কনফারেন্স ক্লাস করাটা এই দুর্যোগের সময় অপরিহার্য। কোন রকম স্পর্শ না করেই কথার আবেগ, শব্দের দক্ষতা দিয়েই অবশ্যই নাট্যকর্মীরা থিয়েটারের কাছে পৌঁছতে পারেন। মনের ভাব প্রকাশ করাটাও থিয়েটারের একটি দিক। শিল্পীরা যেকোনো পরিস্থিতিতেই শিল্পকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। যেখানেই শিল্প সেখানেই শিল্পী।
বিভাবনের সমস্ত নাট্যকর্মীদের অভিনন্দন এই কঠিন সময়েও তারা থিয়েটারের বাহু ও নাট্যকর্মীদের কাঁধ শক্ত করে ধরে আছেন। এই সময়ে এই ভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য এই নাট্যদলকে আমাদের শুভেচ্ছা রইল।



