
মিষ্টু আইচ রায়
জাহ্নবী সাংস্কৃতিক চক্র এবার পনেরো বছরে পদার্পণ করল। জাহ্নবী-কে জানাই অনেক শুভেচ্ছা। ভারত জুড়ে লকডাউন হওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত বিখ্যাত নাটক ‘রক্তকরবী’ দর্শকের কাছে প্রদর্শন করে দর্শকের বাহবা কুড়িয়েছে জাহ্নবী। কলকাতার বুকে তথা বাংলার দর্শকের কাছে জাহ্নবী এই নাটকটি পরিবেশন করে সবার মন কেড়েছেন।
জাহ্নবী এবার দর্শকের ভালোবাসা ও উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে চলেছে তাদের নতুন পথে, অগ্রসর হয়েছে এবার আরেকটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে, সেই নতুন চ্যালেঞ্জটি হল বাদল সরকারের লেখা ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকটি। বাদল সরকার-এর নতুন করে পরিচিতি প্রয়োজন হয় তো নেই তিনি নাটকের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। শুধু নাটক বললে ভুল হবে হয়তো, তিনি তথ্যচিত্রও করেছেন এবং তিনি বিখ্যাত মেকারও একজন। তিনি তার এই নাটক ‘পাগলা ঘোড়া’ ১৯৬৭ সালে প্রথম মঞ্চস্থ করেন। তাঁকে স্মরণ করেই জাহ্নবীর নতুন প্রয়াস ‘পাগলা ঘোড়া’। এই দল তাদের নতুন নাটক ‘পাগলা ঘোড়া’ চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করেছে। তার মেকিং-এর কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন। তারা রিহার্সাল পদ্ধতি শুরু করে নাটকের যথাযথ রূপ দেবার দিকে এগিয়ে চলেছে। শোভাবাজার রাজবাড়ির পাশে একটি ঘরে একত্রিত হয়ে রিহার্সাল চলে, প্রায় দু-মাস রিহার্সাল খুব জোর কদমে চলতে থাকে, কিন্তু ভারতে সেই সময় লকডাউন শুরু হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের রিহার্সাল বন্ধ করতে হয়। কিন্তু থেমে নেই, তারা সবাই তাদের এই নতুন প্রয়াস অনলাইন-এর সাহায্যে আবার শুরু করে দিয়েছেন, শিল্পীরা কখনও কোন পরিস্থিতিতে যে থামে না তার আরও একবার তারা প্রমাণ করে দিয়েছেন, শিল্পীদের কখনও কোন পরিস্থিতি হার মানাতে পারে না, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ জাহ্নবী। এই লকডাউন উঠে যাওয়ার পর কলকাতা তথা বাংলার দর্শককে মুগ্ধ করতে এগিয়ে আসছেন এই দল ও তাদের তারকারা। এই নাটকটিতে অনেকগুলো চরিত্র রয়েছে। সেই চরিত্রে যারা যারা অভিনয় করছেন তারা হলেন – মেঘমালা আইচ রায় মিলি চরিত্রের ভূমিকা পালন করছেন, মধুরিমা ঘোষ- মেয়েটি, ঝুমা ভৌমিক- মালতি, প্রতিম মল্লিক- শশী বাবু, সৌপায়ন জানা- কার্তিক, দেবজিৎ কর- ছাতু বাবু, রাখী মন্ডল- লক্ষ্মী, আকাশ আলী- ডোম, বনিশা সেনগুপ্ত- ডোম-এর বোবা মেয়ে, এবং সমরজিৎ দাস- হিমাদ্রি, সমরজিত দাস তিনি হলেন এই দলের কর্ণধার। পরিচালক এর সাথেই তিনি নিজেও খুব বড়ো মাপের অভিনেতা একজন। এই নাটকটির আবহ তে আছেন- অনিন্দ্য নন্দী, আলো ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন- সৌরভ সরকার। এই নাটকটিতে বাদল সরকার খুব সুন্দর ভাবে প্রতিটি চরিত্রকে ব্যক্ত এবং পরিস্ফুটিত করে তুলেছেন। নাটকটির মূল ভাবনা এই যে, সবার জীবনে কোনও না কোনও সময়ে একবার প্রেম তার জীবনে কড়া নাড়ে, কিন্তু অনেক সময় সেই প্রেমকে অবহেলা, অবজ্ঞা করে সময় না দিয়ে দূরে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের মাপকাঠি যখন সেই ভালোবাসার মানুষটিকে একদিন দূরে নিয়ে চলে যায় তখন সেই ভালোবাসার মানুষটির বোধগম্য হয় যে, তার জীবনের সব থেকে মূল্যবান জিনিসটি তার ব্যর্থতার জন্য দূরে চলে গেছে, তখন শুধু তার কাছে হতাশা আর নিজের জীবনকে ব্যর্থ ভাবা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। এই নাটকে- কার্তিক, শশী, ছাতুবাবু ও হিমাদ্রি তাদের জীবনের অবহেলা ও অবজ্ঞায় হারিয়ে ফেলা ভালোবাসার হতাশার কথা একে অপরের সাথে ব্যক্ত করেছেন। বাদল সরকার এই নাটকটিতে এটাই প্রস্ফুটিত করার চেষ্টা করেছেন যে, সময়ের সাথে নিজের কাছের মানুষটিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত, নয়তো জীবনের শেষে শুধুই হতাশা আর ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আশা করি এই দল এই সুন্দর ভাবনাটিকে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারবেন। এই কঠিন সময় পেরোনোর অপেক্ষায় রয়েছেন সব নাটক প্রেমীরা। তাদের অভিনয়ের সুন্দর ডালি নিয়ে দর্শকের সম্মুখে হাজির হওয়ার অপেক্ষা। এই লকডাউন উঠে যাবার পর এত মাসের পরিশ্রম এত প্রচেষ্টা সব নিয়ে আসতে চলেছে এই দল তাদের নতুন প্রয়াস
‘পাগলা ঘোড়া খেপেছে
বন্দুক ছুড়ে মেরেছে’
সত্যি শিল্পীরা এতদিন গৃহবন্দি হবার পর তারা সত্যিই খুব দ্রুত দৌড়াতে চলেছে। অপেক্ষায় সমগ্র কলকাতা ও বাংলার দর্শকগণ। স্বাগতম ‘জাহ্নবী’।
