ড. রাজলক্ষ্মী বসু ।।
আমরা করোনা যন্ত্রণাতে আরও এক বাস্তবের পুর্নলিখন করতে বাধ্য হচ্ছি। তা হল, উন্নত দেশের সংজ্ঞা। এই করোনার আগে পর্যন্ত যাদের উন্নত দেশ তকমা দেওয়া হতো, তারা আজ সতর্কীকরণ, স্বাস্থ্যবিধি এমনকি সামাজিক দায়িত্বতেও যে আমাদের থেকে ঢের পিছিয়ে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে না হলে কিভাবে এই মারণ রোগের প্রভাব সব দেশের ঊর্ধ্বে হয়?
এরই মধ্যে হইচই শুরু হয়েছিল ভারত কোন যুক্তিতে আর বুদ্ধিতে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওদেশে রফতানি করল। ম্যালেরিয়ার এই ড্রাগটিরও রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরেও কেমন করে এ সম্ভব। শুধুই কি এই ড্রাগ? সর্বমোট ২৬টি পথ্যের উপর রফতানিতে তালা পড়েছিল। আমেরিকা এখন দিশেহারা। হাজারে হাজারে মানুষের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথায় হাত। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য মার্কিন দেশ উঠেপড়ে আদাজল খেয়ে লাগলেও তার জন্য সময়ের কাছেই নতজানু এখন প্রথম বিশ্বের শক্তিশালীতম দেশটি। তারা নাকি হুমকি দিয়েছে ভারতকে! সেই হুমকির ভয়ে নাকি সুবোধ বালকের মতো ভারত ওই দেশে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন রফতানি করল। এমনটাই তো সোশ্যাল মিডিয়ায় বা বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম দায়িত্ব নিয়ে প্রচার করছে। বাস্তব চিত্র জানার পরই হয়ত আমাদের সব সংশয় মিটবে আর ট্রাম্প বীরপুরুষ নাকি আমরা মানবিক রূপে অবতীর্ণ তাও পরিষ্কার হবে। কোভিড-১৯-এর বিষাক্ত নিঃশ্বাসে সারা বিশ্ব দিশেহারা। নিজের রসদ পর্যাপ্ত পরিমাণে না রেখে কোন দেশই এই মুহূর্তে অন্য দেশের প্রতি দয়াময়ী ভাব প্রদর্শন করার মুর্খামি করবে না, এ বোঝার জন্য কাউকে আন্তর্জাতিক বিষয়ের পণ্ডিত হতে হয় না। খুব সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। এই কঠিন পরিস্থিতিতে যে আমরা আমেরিকার মতো দেশকে ম্যালেরিয়ার ড্রাগ (যা কিনা করোনা চিকিৎসায় কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে বলে দাবি) দিতে পেরেছি তা বিশ্বের দরবারে আমাদের মান উঁচুই করল। আরও একটা সত্য জানতে হবে, তা হল ২৫ মার্চের পর হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকাই নয় আরও বিভিন্ন করোনা বিধ্বস্ত দেশেও উল্কার গতিতে পৌঁছে গেছে এই পথ্য। তারা কিন্তু তথাকথিত কোনও হুমকি দেয়নি। সংকটজনক পরিস্থিতিতে সবরকম পথ্যই রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা সাধারণ নিয়মে জারি করা হয়। অর্থাৎ আলাদা করে ম্যালেরিয়ার ওষুধ সে তালিকায় ছিল না। যেহেতু করোনাতে ম্যালেরিয়ার এই ওষুধে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে তাই এই ওষুধের উপর আপাতত রফতানি বাঁধন কিছুটা শিথিল করা হল। এ ছাড়াও ভাঁড়ারে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকা আরও ২৩টি ওষুধের উপর থেকেও সেই বাঁধন আলগা করা হয়। বেশ কিছু প্রতিবেশী দেশ কেবলমাত্র আমাদের ওষুধের উপরেই নির্ভর করে। কেবলমাত্র আমাদের সহযোগিতায় তারা আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে— We will also supplying these essential drugs to some nations who have been particularly badly affected by the pandemic. We would therefore discourage any speculation in this regard of any attemps to politicise the matter. দুটো শব্দ বেশ গুরুত্বপূর্ণ speculation এবং politicise. এই দুটোই সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। কারণ, দেশপ্রেমিকদের আকস্মিক প্রেম জেগে উঠেছে এই রফতানির হেতু। সমালোচনার ঝড় বইছে। এ ক্ষেত্রে জ্ঞাত থাকা উচিত সারা বিশ্বের ৭০ শতাংশ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রস্তুতকারক ভারত। ইন্ডিয়ান ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারাস-এর হিসেবানুযায়ী এদেশে বছরে ২৪ মিলিয়ন ট্যাবলেট লাগে। এই রফতানি বন্ধের মুহূর্তেও ভারতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের বাৎসরিক ৪০ মেট্রিক টন Active Pharmaceutical Ingradients (API)-এর উৎপাদন ছিল। এর থেকে বছরে ২০০ এমজি-এর ২০০ মিলিয়ন ট্যাবলেট কমপক্ষে প্রস্তুত করা সম্ভব। এদেশে উৎপাদন এবং মজুত দুইই পর্যাপ্ত। তাই এমন মাথাব্যথার কোনও যুক্তি নেই যে ওষুধের টান আসবে। যদি আমেরিকার ডাকে সাড়া না দিতাম তা যেমন অমানবিক হতো, তেমনই কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরালে পাজির মতো আচরণ হতো। কারণ করোনা থাবার যন্ত্রণায় সারা বিশ্ব যখন ছটফট করছে তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২.৯ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারের সাহায্য প্রসারিত করে আমাদের দিকে। United State Agency for International Development (USAID)–এর ডেপুটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটার বনি গ্লিক-এর সাংবাদিক মুখোমুখি অনুযায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্যতে ওদের দেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু তারাই যখন আমাদের দিকে চেয়ে থাকে, তা বোধহয় বিশ্বের দরবারে সম্মান বাড়ায়। ইতিমধ্যেই আমেরিকা ১.৩ মিলিয়ন, ১.৮ মিলিয়ন, ৩.৪ মিলিয়ন এবং ৫ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশ এবং আফগানিস্থানে করোনা মোকাবিলায় দিয়েছে। ঠিক এই সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ভাঁড়ার থেকে আমেরিকা ও কিছু দেশে রফতানি আমাদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আসন ব্যাপ্তি পাকা করল। এবার দেখা যাক কে কাকে হুমকি দিয়েছে। ট্রাম্প সাহেবের কথাবার্তা তো আর মাননীয় অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো নয়। কাঠখট্টা আর ব্যবসায়িক ধরনের ব্যক্তিত্ব। তার উপর সামনে খাঁড়া, আমেরিকার সাধারণ নির্বাচন। পরিস্থিতি সামাল তারপর ভোট নির্ধারণ সব মিলিয়ে উনার এখন হিমশিম অবস্থা। রাজনীতি না বুঝে রাজনীতিক হওয়ার যে কি জরিমানা তা এই মুহূর্তে ট্রাম্পের চেয়ে ভালো আর কেউই জানেন না। নিরস চোখ মুখের ভঙ্গিমা আর অভিব্যক্তিবিহীন বেসামাল কথা যে আগেও উনার বক্তব্যকে হেডলাইনে এনেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন প্রসঙ্গে এবং পরিস্থিতিতে ‘হুমকি’ দিয়েছেন তা জানতে হবে। এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন— Sir, are you worried about retaliation to your decision to ban exports of medical goods like Indian Prime Minister Modi’s decision to not export HCQ to the US and other countries? এর জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমি এই সিদ্ধান্তটা পছন্দ করছি না। এটা তাঁর সিদ্ধান্ত বলেও শুনিনি।… আমি গতকালই উনার সাথে কথা বলেছি। দু-জনের মধ্যে খুব সুন্দর আলোচনা হয়েছে। আমি খুব অবাক হবো যদি উনি এই সিদ্ধান্ত নেন, কারণ ভারতের সাথে আমেরিকার খুব ভালো সম্পর্ক।… আমি উনাকে বলেছিলাম আমরা আপনার প্রশংসা করব, যদি আপনি সরবরাহ চালু করেন। যদি না করেন কি আর করব। সেক্ষেত্রে আমরাও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারি। কেন নেব না! ওই শেষ কথা নিয়েই গেল গেল রব তুলল এ দেশের একদল বামপন্থী পণ্ডিত। খুব স্বাভাবিক বুদ্ধিতে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প স্বেচ্ছায় কোনও প্রসঙ্গ তোলেননি। নরেন্দ্র মোদির সাথে কি কথা বা আলোচনা হয়েছে তা তিনি অবাধে কোনও সাংবাদিক বৈঠক করে বলেননি। প্রসঙ্গক্রমে বক্তব্য ছিল, যে সাংবাদিক ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি হলেন এবিসি নিউজের হোয়াইট হাউজ সাংবাদিক জোনোথাল কার্ল। ট্রাম্প সাহেবের চক্ষুশূল। প্রতিবর্ত ক্রিয়াতে কড়া কথায় ট্রাম্পের বেশি কড়া উত্তরটাই এত চর্চার কারণ। প্রসঙ্গক্রমে বলা উচিত কোনও হুমকিতে নরেন্দ্র মোদি সিদ্ধান্ত বদলাননি। ২০১৮ সালেও আমেরিকার হুমকি এসেছিল এদিকে, তাকে উপেক্ষা করেও পাঁচটা এস-৪০০ ট্রাম্ফ সারফেস-টু-সারফেস এয়ার মিসাইল রাশিয়ার থেকে নেয় ভারত। মোট ৫.৪৩ বিলিয়ন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল। বিশ্ব রাজনীতি এত ঠুকনো না। যারা অনবরত সমালোচনা করছেন তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিজেপি-তৃণমূল-কংগ্রেস এই লড়াই-এর বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছেন না। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রি কোল্ড ওয়ারের মতো মেরুকরণ এখন বোধহয় আর হয় না। পোস্ট কোল্ড ওয়ার মানসিকতায় এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো দণ্ডায়মান। সেখানে বাণিজ্য সম্পর্ক বড়ো সম্পর্ক। তাই কোনও রাষ্ট্রই সরাসরি হুমকি দিয়ে তিক্ততা গঠন করতে রাজি না। প্রসঙ্গক্রমে বলা ভালো ওইদিন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজ সপ্তমে ছিল। ফক্স নিউজের এক সাংবাদিককেও খিটখিট করেছেন। এ উনার স্বভাবগত ভঙ্গিমা। যে সব বিদ্বজনেরা উক্ত বিষয়কে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, তাদের কেবল অকারণ বিরোধিতাই না, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নিয়েও সংশয় আছে। তারা এখনও ভারত-মার্কিন সম্পর্ক শুনলেই ইন্দিরা গান্ধির আমল ভাবেন। কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অনেকটা পথ অতিক্রম করেছি। আর পিছনে ফেরা বারণ। (মতামত লেখকের নিজস্ব)
