কথা কানে যায় না

ড. রাজলক্ষ্মী বসু ।।

পরাধীন ভারতের এক ঘটনা বলি। Indian Annual Register, 1924, vol II-তে বলেছিল সেপ্টেম্বর ১৯২৪-এ একটি মুসলিম সংবাদপত্র হিন্দু বিদ্বেষী কবিতা প্রকাশ করে। সেদিন কোনও শিক্ষিত মুসলিম চাপে হোক বা যে কারণেই হোক বিষয়টা যে ভুল, তাও বলেননি। জীবন দাশ নামক এক সনাতন ধর্মসভার সদস্য ওই ঘটনার বিরুদ্ধে লিফলেট বিলি করলে, এ দেশের হিন্দুরা ওই লিফলেটের জন্যই দুঃখ ও অনুশোচনা প্রকাশ করে। কেবলমাত্র শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে। জীবন দাশ গ্রেফতার হন। পরে জামিনও হয়। পরের দিনই মসজিদে বড়ো সভা হয়, দলে দলে মুসলমান তাদের স্ত্রীদের তলাক দেন। কিন্তু কেন? তারা এই জীবন দাশের ব্যাপারে বা তাদের ধর্মকে যে আঘাত করেছে, বা যারা করেছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেবে নয়তো মৃত্যু বরণ করবে। তারা সেদিনও আইনে বিশ্বাস রাখেনি। তৎকালীন প্রশাসনও তাদেরকে তাদের মতো কাজ করতে দিয়েছিল। দেশ স্বাধীনতা পাওয়ার এতো বছর পরেও বারে বারে বহু চিত্র এমন সামনে আসে, যাতে প্রমাণ হয়, তাদেরকে তাদের মতো নীতি এখনও অনেক ক্ষেত্রে বহাল। এই যেমন ধরি, কড়াকড়ি লকডাউনের মধ্যেও গত একদিন আগে মুর্শিদাবাদের ঘটনা। এটা তো তারা তাদের মতো চলারই আরও এক নমুনা। গত ১০ এপ্রিল ২০২০ স্বরাষ্ট্র দফতর পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একটি চিঠিতে স্পষ্ট বার্তা দেয়, যে প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রির নামে বেশ কিছু অঞ্চলে মাংসের দোকান পর্যন্ত খোলা। মানুষের গাদাগাদি ভিড়। সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই মেটিয়াবুরুজ, গার্ডেনরিচ, তপসিয়া, রাজাবাজার, নারকেলডাঙ্গা, একবালপুর এবং মানিকতলা অঞ্চলে। এর মধ্যে সব কটি অঞ্চলেই সংখ্যালঘুর ঘনত্ব এবং বস্তির সংখ্যা বেশি। নারকেলডাঙ্গা অঞ্চলে COVID 19-এর মতো সিমটমস-এর বেশ কিছু মানুষ ধরাও পরেছেন। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক দূরত্ব বজায়ের সহযোগিতা চায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে উক্ত দিনের আগের দিনেও নির্দেশ এবং রাজ্যের তরফ থেকে জানাতে বলা হয়েছিল যে, সব ধর্মীয় স্থল যেন বন্ধ থাকে। তারপরেও সেই এক চিত্র। মুর্শিদাবাদে একটি মসজিদ খোলা হয় এবং থিক থিক ভিড় সেখানে। নামাজের জন্য। প্রশাসন বেশ প্রশমিত। জিজ্ঞাসা এই ক-জনকে টেনে এনে গ্রেফতার করা হয়েছে? জিজ্ঞাসাবাদ কতটা জোরালো, কে কখন কার অনুমতিতে এই উপাসনা গৃহ খুলল? কত মানুষ একজোট হয়েছিল? তারা সবাই কি পুনরায় রাস্তাঘাট বাজারে স্বাভাবিক ছন্দেই ঘুরে ফিরে বেড়াবেন। অনেক জিজ্ঞাসা। করোনা আক্রমণ তৃতীয় স্তরে অর্থাৎ গোষ্ঠী সংক্রমণের দোড়গোড়াতে আমরা। এই সচেতনতাটুকু বা প্রশাসনের নজরটুকু কেন নেই? আরও একটা জিজ্ঞাসা, উক্ত অঞ্চলে এত লোকের সমাগম হলো, তাহলে ওই অঞ্চলের মনিটরিং-এর জন্য কি কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা বা সমাবেতকারীদের টেস্ট করা সম্ভব হয়েছে? যে ভিডিও দেখতে পাওয়া গেছে বা সংবাদমাধ্যমে যেটুকু দেখা গেছে, তাতে একজন পুলিশবাবু মিন মিন করে অনুরোধ করছেন, চলে যাওয়ার জন্য। এর পর আমরা যে আর কিছুই জানি না। দুধ দেওয়া গরু যে জীবাণু ছড়াচ্ছে না এমন তো না। তবলিগ জমাতের অনুষ্ঠানে এ রাজ্যেরই প্রথম পরিসংখ্যা অনুসারে ৭৩ এবং যা পরে তিনশোর আশেপাশে ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছিল, যারা সবাই আপাতত রাজারহাটের গৃহে কোয়ারেনটাইন-এ। কিন্তু এদের পূর্ণাঙ্গ রুট ম্যাপ বা কিছু কি জানা গেছে? তাই আশঙ্কা একটু বেশি থেকেই যাচ্ছে। সংখ্যালঘু এই একটা শব্দের জোরে appeasement পলিসিতে এ দেশের কংগ্রেসি নেতারা তাদের একদিকে যেমন ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করেছে তেমনই বহু সময় তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বোঝাপড়ার কাজটাও করেছে। মরলে মিন্টো রিফর্মস-এর পরেই এদেশে তাদের তোষণ রেওয়াজ শ্রীবৃদ্ধি পায়। গান্ধীজি নিজেই বলে গেছেন “if Hindus wish to cultivate eternal friendship with Musalmans, they must perish with them in the attempt to vindicate the honor of Islam” (Mahadev Deshai, Day-to-Day with Gandhi, vol 4, Sarva Seva Sangha Prakashan. 1969)। এই কঠিন পরিস্থিতিতে ধর্মচর্চার হেতু এতো মানুষের বদ্ধস্থলে একজোট কোনও ধর্মীয় যুক্তিতে কি গ্রহণযোগ্য? ইসলাম তো প্রকৃতি পুজো করে। তাহলে মানুষের হিতার্থে কি একটু বিরত রাখা যায় না? হয়তো যায় না। যায় না, তার প্রমাণ বহু ক্ষেত্রে পেয়েছি, আর লিখিত নথি পেয়েছিলাম ১৯২৪-এর ১০ এপ্রিল ইয়ং ইন্ডিয়া-তে। সেদিন মহম্মদ আলি এক দীর্ঘ চিঠিতে বলেছিলেন  “…I am bound to regard the creed of Islam as superior to that professed by followers of any non- Islamic religion”।

আজ তো তারাপীঠ থেকে দক্ষিণেশ্বর মন্দির এমনকি পাড়ার ছোটো মন্দির, গুরুদ্বার সব বন্ধ। এর আগেও ধরা দিয়েছে মেদিনীপুরে মসজিদ খোলা। আরও বেশ কিছু এমন দৃশ্য, চক্র সম্পূর্ণ করল দিল্লির নিজামুদ্দিন-এর তবলিগ জামাত, তারপর আবার মুর্শিদাবাদ। আশা করছি “ছোটো খাটো” বিষয় বলে এটা দেখা হবে না। নাকি নিছকই “দুষ্টুমি” করছে বলে হালকা করে দেখা হবে, তাই বা কে জানে! যদি কোনো মন্দিরে এভাবে ভিড় হয়, তাহলেও তা একইভাবে নিন্দনীয়। নিন্দা আমরাই করব। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার মতো মারণ বোমা গঠনের কাজ করব কি? সার্বিক ভাবে সচেতন কবে হবো? আর সময় কিনছি এখন আমরা। পন্ডিত লেখা রাম হত্যা হয়, কেবলমাত্র মুসলিম ধর্মাচারণের ত্রুটিগুলি নিয়ে কলম ধরার জন্য। ব্যবহারিক ত্রুটি সামাজিক ত্রুটি যখন ওই একই সম্প্রদায়ের দ্বারা হয়, তখন তা আলোচনার লোভ সামলানো কঠিন। পন্ডিত রামের ইতিহাস জেনেও লোভ সামলানো যায় না।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

Leave a comment