ড. রাজলক্ষ্মী বসু ।।
ভারতীয় সংস্কৃতি বিতর্ক এবং তার দ্বারা গঠনমূলক তত্ত্বকে স্বীকৃতি এবং সম্মান সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই দেয়। তাই তো বলে— ‘বাদে বাদে জয়তে তত্ত্ববোধ’। বর্তমানে নানান মত মতবিবাদ ও নতুন অভিমত গঠনের এক বিশেষ ক্ষেত্র হল ভারতীয় সংসদ ভবন। লোকতন্ত্রের এক বিচিত্র নিয়মই হল পরিসংখ্যা। সংসদ ভবন সেই পরিসংখ্যাকেই পরোক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। যখন যে রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই তাদের মত বা ভাষণের বিতর্ক করবে বিরোধী পক্ষরা। কিন্তু বিরোধিতা কাকে বলে? অভদ্র চিৎকার, ভাষার কদর্য অবনমন এবং বিরোধিতার শিখণ্ডি খাড়া করে সংসদে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি কি সত্যিই বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্ক এব দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয়বাহক! ভারতীয় সংবিধানের এও এক গর্ত। আসলে সত্যি এটাই যে সময় সংবিধান রচনা হয়েছিল, তখন এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংসদের ভঙ্গিমা হয়তো কল্পনাও করা হয়নি। তাই অস্থিতিস্থাপক আচরণের মতো আপেক্ষিক সংসদীয় অন্যায়ের শাস্তির কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু সংসদীয় আইনে কিছু শাস্তির উল্লেখ ও প্রয়োগ দেখা যায়। গত মার্চ মাসের সংসদীয় সভায় কংগ্রেসের তরফ থেকে আচরণগত বেশ ত্রুটি ও ভারসাম্যহীনতা নজরে এসেছে। অথচ পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুই তাঁর Comprehensive Moderization তত্ত্বে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিকে বড়ো ভূমিকা বলে চিহ্নিত করেন। জাতীয় ঐক্যেরও বড়ো সূচক এই সংসদীয় ভদ্রতা। ‘Sine Qua-non’ কে সর্বাধিকার তখনই দেওয়া সম্ভব যখন বিরোধিতা হবে শিষ্টাচারের যুক্তির তত্ত্বের তথ্যের ভিত্তিতে। জওহরলাল নেহরু পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি জোরালো রূপে নির্মাণের জন্য গান্ধীজির প্রদত্ত বিকল্প মডেল বিন্দুমাত্র অনুসরণ করেননি। যেমন, ‘Gandhi’s bottom up democracy বা পরবর্তী সময়ে স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনের ভিত্তিতে জয়প্রকাশ নারায়ণ ‘Partyless Parliamentary’ ডেমোক্রেসির উল্লেখ করলেও তা তৎকালীন পণ্ডিতদের কর্ণপাতের যোগ্যতা অর্জন করেনি। যার পরিণামেই হয়তো আমাদের দেশবাসী হিসেবে বারে বারে লণ্ডভণ্ড সংসদ ভবন দেখতে হয়েছে আর ধিক্কার দিতে হয়েছে। এই মার্চ মাসের ২ এবং ৫ তারিখে কংগ্রেসের সাত সাতজন সাংসদের সাময়িক বরখাস্তের মতো ঘটনা ঘটল। লোকসভার স্পিকার মাননীয় ওম বিড়লা কার্যত বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নেন। উক্ত সাংসদেরা তুমুল হইহট্টগোলের সময় সংসদ ভবনের এদিক থেকে ওদিক দৌড়ঝাঁপ করেন যা হাউস-এর সম্মান, ঐতিহ্যের জন্য পরিতাপের তো বটেই এবং পার্লামেন্ট সেশনকেও ভণ্ডুল করে দেয়। বিরোধীরা কক্ষের ওয়েলের দিকে ধেয়ে যান প্লাকার্ড হাতে গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ-এর পদত্যাগের দাবিতে। উপলক্ষ দিল্লির উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং দাঙ্গা। অভদ্রতা এতটাই সীমা লঙ্ঘন করে যে, স্পিকারের সম্মানের তোয়াক্কা না করে, তাঁর প্রয়োজনীয় নথি কেড়ে নেয় বিরোধীরা। এ কেমন গণতন্ত্র! যেখানে আসনের মর্যাদাটুকু দেওয়ার ধৈর্যও নেই। পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী অসন্তুষ্ট হয়ে উক্ত বিরোধীদের পদত্যাগেরও দাবি তোলেন। প্রশ্ন একটাই, সাসপেনশনই কি সব কিছুর পাঠ দেয়? রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সহজপাঠ কি আমরা তাহলে ভুলতেই বসলাম! পণ্ডিত নেহরুর সাথে এই ভবনেই তো অটলবিহারী বাজপেয়ীর কম তর্ক হয়নি। বিনিময়ে অটলজি কি পেয়েছিলেন? আশীর্বাদ। পণ্ডিত নেহরু বলেছিলেন, এই ছেলেই একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে। দশকের পর দশক ধরে সাসপেন্ড আর সাময়িক ভ্রুকুটি, স্পীকারের উষ্মা এই হয়ে আসছে ভবনের অসভ্যতার পরিণাম। গত দু-দশকে এই উত্তেজনার দৃশ্য বেশ সাধারণ বিষয়। বাঙালিদের আরও গা সওয়া হয়ে গেছে খোদ বিধানসভায় মমতাদেবীর উপস্থিতিতে তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ কর্তৃক ভাঙচুরের দৃশ্য দেখে। ফিরে যাই সংসদ ভবনে পুনরায়। বাক্যুদ্ধের মধ্যে বিরোধীরা ইগো, ওয়াকআউট এসবের সংযোজন করেছে। স্লোগান দেওয়ার কক্ষ কি সত্যিই এই ভবন? কাকে স্লোগান দিচ্ছি! দেশ যে স্বাধীন। উপনেবেশিক ঘরানার বেশ কিছু আচরণ আর যে মানানসই নয়। এমন না যে কেবল ওম বিড়লাই শক্ত হাতে হাল ধরলেন। পূর্বেও সুমিত্রা মহাজন, মীরা কুমারীরাও কড়া হতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৮৯ মার্চ ১৫, রাজীব গান্ধির আমলে ৬৩ জন সাংসদকে শিষ্টাচারহীনতার দায়ে সাসপেন্ড হতে হয়। তবে মাত্র তিনদিনের জন্য। সুমিত্রা মহাজন ২০১৫-তে ২৫ জন কংগ্রেসি সাংসদকে পাঁচদিনের জন্য ভবন বহির্ভূত করেন। ওম বিড়লা মহাশয় ইতিপূর্বেও ভবনের মান শিষ্টাচার রক্ষার্থে কঠোর হয়েছেন। গত বছর নভেম্বরেও দু-জন কংগ্রেস সাংসদকে সাসপেন্ড করেন তিনি। মজার বিষয় এই যে, একজন মাননীয় স্পীকারের যখন সাংসদ সাসপেনশনের ক্ষমতা থাকে এবং প্রয়োগ করেন, তৎক্ষণাৎই তা প্রত্যাখ্যান করে ভবনের অচলাবস্থা রাখার পন্থা বিরোধীরা নিতে পারেন। গণতন্ত্রের জ্বালা কি কম! বিশ্বের কি অন্য দেশে তর্ক-হল্লা হয় না। পার্লামেন্ট তর্কের মুক্তাঞ্চল। ইংল্যান্ড তাতে প্রথম। তর্ক বাকবিতন্ডায় ওদের প্রথম পুরস্কার দিতেই হবে। ওদের পার্লামেন্টিরিয়ান সাসপেন্ড হলে তার উক্ত সময়ের বেতন কাটা যায়। আমাদের দেশে কি এই পদ্ধতি চালু করা যায় না? সংসদ ভবনের সম্মান যাদের হাতে তারা যদি অবিবেচক হন তাহলে আপামর মানুষ কি আশা করবে? বিগত দিনেও সিভিল অ্যাভিয়েশন মন্ত্রী মহেশ শর্মা ‘No work no pay’ আইন প্রণয়নের বিষয়টি উত্থাপন করলেও তা রূপান্তরিত হয়নি। বিরোধীদের পার্লামেন্টে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সরকারের নীতি বা প্রস্তাবের সমালোচনা, যুক্তি ও তথ্যনিষ্ট বলে তার সংযোজন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন করার প্রস্তাব বিরোধীরাই দেবেন। তিনটি ‘D’-এর উপর দণ্ডায়মান ভারতীয় সংসদ, Discuss, Debate & Dissent. এই তিনটি ‘D’ প্রসব করে চতুর্থ ‘D’— Decision. কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে তৃতীয় ‘D’-টি বদলে ‘Disrupt’ হলেই আর Decision-এর জন্ম নেয় না। তখন লণ্ডভণ্ড চিৎকার হল্লা— এক মেঠোহেটো পরিস্থিতি।
বিরোধীদের দায়িত্ব কেবলই বিরোধিতা করা না। ভবনে থেকে বিরোধিতা করে পরিমার্জিত সিদ্ধান্তের জন্ম দেওয়া। আজকের কংগ্রেসিরা যেন স্মৃতিবিস্মৃত না হন পণ্ডিত নেহরুর প্রথম ক্যাবিনেটে অনেক অকংগ্রেসি এমনকি কংগ্রেস-বিরোধী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু সেদিন সেই বিরোধীরা যেমন ড. আম্বেদকর বা ড. শ্যামাপ্রসাদ কেউই বিরোধিতার নামে আসনের সম্মান ক্ষুণ্ণ করেননি। দলের ত্রুটিগুলির বিশ্লেষণ ক্ষমতা যতদিন সম্পূর্ণ না হয়, বিরোধিতা মার্জিত রূপ ততদিন পায় না।
