সুদীপ সিনহা
বিবিসির বিশ্বখ্যাত ডকুমেন্টারি ‘হিমালয়াস’-এর কথা মনে পড়ল। ছবিটা মাইকেল প্যালিনের তৈরি। যেখানে পাকিস্তান সফরের সময় প্যালিন হিন্দকুশের নিচে চিত্রাল উপত্যকায় যাওয়ার সময় রুম্বুর নামক একটি গ্রামে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন সেই গ্রামের বাসিন্দারা যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা, গোটা পাকিস্তানের সঙ্গে যাদের কোনো মিল নেই। তাঁরা মুসলিম নয় বলে পাকিস্তানিরা তাঁদের কাফের বলে, এবং তাঁদের গ্রামকে বলে কাফেরস্তান। এই মানুষগুলো কালো রঙের পোশাক পরে বলে ওদের বলা হয় ‘কালাশ’, তাঁদের নামেই ওই উপত্যকার নাম কালাশ উপত্যকা। কালাশদের পোশাক কালো হলেও গায়ের রং ফর্সা, নাক টিকোলো, চোখের তারা নীল। প্যালিন কারণটা জানতে পারেন ওখানে গিয়ে। এদের পূর্বপুরুষরা হল আলেকজান্ডারের সৈন্যবাহিনীর ঔরসজাত।
রাজডাঙা দ্যোতকের নবতম প্রযোজনা ‘রাবণ’ দেখতে গিয়ে আমার কালাশদের কথা মনে পড়ল। যেখানে রামের সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয় এক রজকের স্ত্রী এবং হনুমান তাঁকে বোঝায় যে সৈন্যরা কোথাও গেলে এমনটা হয়, হতেই পারে। সেটা মেনে নিতে হয়। উজ্জ্বলবাবুর স্ক্রিপ্ট খুব নাড়া দিয়ে গেল। আর্য-অনার্যদের সংঘাত, রাম-রাবণের মধ্যে কে ঠিক-কে ভুল, সেসব নিয়ে পাতার পর পাতা চর্চা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে রামের জায়গায় রাবণকে নায়ক বানিয়ে নতুন করে রামায়ণ লেখা পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু উজ্জ্বলবাবু এখানে বেশ কিছু অনুষঙ্গ এনেছেন যা চমকে দেয় দর্শকদের। রাম যখন আঙুল তুলে মঞ্চের সামনে এসে বলে ‘আমার কথাই আইন’, মস্তিস্কে বিদ্যুৎ ঝলসায় যেন।
অভিনয়ের কথা আলাদা করে কী বলব! রামের চরিত্রে ব্রতীনবাবু, রামের সীতা (অ্যানী সেন) খুব ভালো। বাঁদররা বেশ মিষ্টি। রজকদম্পতি, বিশেষ করে স্বাগতা, দারুণ। একটি দৃশ্যে মাতিয়ে দিয়ে গেছে অনন্যা। বাকিরাও বেশ।
এবং শান্তনু নাথ। শান্তনুকে দেখেছি ‘ম্যাকবেথ সিনড্রোম’-এ (সেটাও উজ্জ্বলবাবুবর স্ক্রিপ্ট) থেকে। কী ম্যাজিকটাই না করল মঞ্চে। ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে চেঞ্জ করে যাওয়া, অভিনয়ের এক কমপ্লিট প্যাকেজ! অনেক নাটকীয় মুহূর্তের মধ্যে ক্রন্দনরত সীতার পাশে একই ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে কেঁদে ওঠা, ওটা বোধহয় মাস্টার স্ট্রোক ছিল।
আলো, মঞ্চ, আবহ যথাযথ। আলাদা করে বলতে হবে পোশাকের কথা। মধুমিতা ধাম চ্যাটার্জির পোশাক ভাবনা চমৎকার। মৃত ও জীবিত রাবণের দু-রকম পোশাক, হনুমান বা বাঁদরসেনার পোশাকে অভিনবত্ব দেখার মত। তবে চমকে দিয়েছে সীতার পোশাক, রক্তকরবী-র নন্দিনী যেন অবিকল!
পরিচালক শুভাশিসবাবুকে ধন্যবাদ এমন একটা নাটক উপহার দেওয়ার জন্য। ছোটোখাটো ভুলচুক যা হয়েছে নিশ্চয়ই তা পরের শো থেকে আর হবে না, এটা আশা করি। ‘রাবণ’-এর জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক। রাজডাঙা দ্যোতকের গোটা টিমকে অভিনন্দন।
নাটক : উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, নির্দেশনা : শুভাশীষ ভট্টাচার্য, মঞ্চ : দেবাশীষ দত্ত, আবহ : শুভদীপ গুহ, আলো: সৌমেন চক্রবর্তী, রুপসজ্জা: সঞ্জয় পাল, পোশাক : মধুমিতা ধাম, অভিনয়ে : রাবণ- শান্তনু নাথ, সীতা- অ্যানী সেন ও অর্কজা- আচার্য, রাম- ব্রতীন গঙ্গোপাধ্যায়, লক্ষণ- দেবরুপ, বশিষ্ঠ- প্রসেঞ্জিত, হনুমান- সুব্রত, রজক- অভিজিত, রজকিনি- স্বাগতা, মন্দোদরী- অনন্যা পাল, বানরকুল- সমীর, সান্ধ্যদীপ, সৌরভ, অনিরুদ্ধ, দাসী- আত্রেয়ী ও বর্ষা।

