মামন জাফরান

ভবানীপুরের পিজি হাসপাতালের কাছাকাছি থাকে দেবশ্রী দাস। তিনি পেশায় একজন শিক্ষিকা। সিবিএসই এবং আইসিএসসি বোর্ডের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ান। জনা দশেক স্টুডেন্ট নিয়ে প্রতিদিনই উদয়াস্ত খাটুনি চলে। ইতিহাস এবং ভূগোল— এই দুটি বিষয় নিয়ে দেবশ্রী শিক্ষকতা করেন। বাবা সমীরকুমার দাস একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। এখন অবসর নিয়েছেন। মা শর্মিলা দাস গৃহবধূ। অত্যন্ত বনেদি এবং রক্ষণশীল একটি পরিবার। এই পরিবারের মেয়ে হয়ে মডেলিং-এর মত পেশায় আসার স্বপ্ন দেখাটাও অসম্ভব ব্যাপার। অথচ সেই ছোট্টবেলা থেকে এই অসম্ভব ইচ্ছেটা ছিল দেবশ্রীর। বাড়ি থেকে হুটহাট করে বেড়িয়ে পড়ার স্বাধীনতা এই পরিবারের মেয়ে হিসেবে কোনওদিনই ছিল না। একে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, তার ওপর সুন্দরী এবং রূপসী। তাই হয়ত মায়ের শাসনটা একটু বেশিই ছিল। অথচ এলগিন রোডের জুনিয়ার ডে স্কুলের ইংরাজি মিডিয়ামের ছাত্রী হিসেবে বাড়ি থেকেই পড়তে পাঠানো হয়। ব্যাস এইটুকুই। স্কুল জীবনে এন্টারটেনমেন্ট বলতে ছিল টিভি দেখা। দেবশ্রী জানালো, টিভিতে সিনেমা, মডেল শো ইত্যাদি তার খুবই পছন্দের ছিল। স্কুল জীবনের প্রথমদিকটায় পড়াশোনা বলতে দাগ রেখে যাবার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের যেমন রেজাল্ট হয় দেবশ্রীরও তাই হতো। অর্থাৎ লেখাপড়ায় খুব ভালো বলা যাবে না। মা এটা পছন্দ করতেন না। তিনি চাইতেন তাঁর একমাত্র সন্তান লেখাপড়ায় সকলকে ছাপিয়ে যাক। ক্লাস নাইনে ওঠার পর পড়াশোনার চাপও বেড়ে যায়। ততদিনে টিভি দেখার নেশাটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। টিভিতে শুধুই সিনেমা, অভিনয়, মডেলিং দেখাই নয় এর পাশাপাশি খেলাধুলা দেখার ইচ্ছেটাও ছিল প্রবল। ফুটবল, হকি, বাস্কেটবল, ক্রিকেট এইগুলো দেবশ্রীর প্রিয় খেলার মধ্যে পড়ে। টিভির প্রতি এমন ঝোঁক বাড়তে দেখে মা তো রেগে অগ্নিশর্মা। টিভির তারটাই ছিঁড়ে দেন। দেবশ্রী হাসতে হাসতে বলল, জীবনের ৬টা বছর টিভিই দেখিনি। জুলিয়ান ডে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হই মেমোরিয়াল গোখেল কলেজে। কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি। এরপর বাড়ির রক্ষণশীলতার ঠিক উল্টো পথে হেঁটে একজনের প্রেমেও পড়ে। সে প্রেম অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বছর দুয়েক হতে না হতেই ব্রেকআপ হয়ে যায়। তাই নাকি? তারপর এমন কোনও এপিসোড আর নেই? রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে বলল, না। এমএ পাশ তো করেছো, বাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ দেখাশোনা হচ্ছে না? দেবশ্রী জানাল, এক্ষুনি তেমন কিছু নয়। বাবা-মা সেরকম কোনও কিছু এমন জোর দিয়ে বলছে না তাই আমারও এমন কিছু চাপ নেই। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না তবে এক্ষুনি বিয়ের পিড়িতে বসছি না। এরপর দেবশ্রীকে প্রশ্ন করি, তুমি রক্ষণশীল পরিবারের একমাত্র মেয়ে, উচ্চশিক্ষিতা, শিক্ষিকা, তুমি নিজেই বললে একসময় টিভি দেখতাম বলে টিভির তার ছিড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই তুমি মডেলিং দুনিয়ায় পা দিলে কি করে! রক্ষণশীল পারিবারিক অবস্থান থেকে কোনও বাধা এলো না? কেউ কিছু বলল না? নিষেধ করল না? দেবশ্রী উত্তর দিল, এই ব্যাপারটা অদ্ভুদভাবে হল। বাড়ির লোকজন মেনেও নিলো। ২০১৯-এর মে মাসে সানন্দায় ফটোশ্যুট করার জন্য নতুন মডেল চেয়ে একটা বিজ্ঞাপন বেরোলো। ওরা মেকওভার সেকশনের জন্য ছবি চাইলো। আশ্চর্য কাণ্ডটা হল যে মা টিভি দেখতে দিত না, সেই মা-ই বলল, এখানে ছবি পাঠাতে। আমিও কয়েকটা ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলাম। তখনও ব্যাপারটা সিরিয়াসলি ভাবিইনি। হঠাৎ ওরা খবর দিল যে, আমার ছবি নির্বাচিত হয়েছে। আমি সিলেকটেড। ১৫ জুলাই ২০১৯ আমার ছবি ছেপে বেরোলো। সত্যিই সেটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় এবং অ্যাচিভমেন্টের দিন। তারপর থেকে একের পর এক সুযোগ আসতে লাগলো। বেশ কয়েকটি অ্যাড এজেন্সি জুয়েলারি মডেল হিসেবে আমাকে কাজ দিল। ফটোশ্যুটের কাজ সেই থেকে প্রায় লেগেই রয়েছে। কিছু পোশাক কোম্পানির ওয়েস্ট্রান ড্রেসের মডেল হিসেবে কাজের অফার এসেছে। তবে আমি একটু খুঁতখুঁতে। কাজ এলো বলেই আগে-পিছে না ভেবে হ্যাঁ বলে দিলাম— এটা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। আমি বেছে কাজ নিই, যত্ন করে সেটা করার চেষ্টা করি। নিজেকে ১০০ ভাগ উজাড় করে দিয়ে সৎভাবে কাজ করতে চাই। পাশাপাশি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি দায়বদ্ধতাটাও রয়েছে। তাদের পরীক্ষা এগিয়ে এলে একটু বেশি সময় তো দিতেই হয়। আপাতত এই দু-দিকটাই ব্যালেন্স করে চলার চেষ্টা করছি। এখনও তেমন কোনও অসুবিধায় পড়িনি। সব থেকে বড়ো কথা হল, কনজারভেটিভ পরিবারের একমাত্র মেয়ে হয়ে আজ আমি যে শিক্ষকতার পাশাপাশি মডেলিং দুনিয়াতেও সসম্মানে পা রাখতে পেরেছি— এটাই আমার নিজের কাছেই একটা বিস্ময়। যতই রক্ষণশীল হোক পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে বাবা-মা-র প্রচ্ছন্ন অনুমতি ছাড়া এটা করতেই পারতাম না। তাই মাঝে মাঝে ভাবি বনেদি পরিবারের রক্ষণশীলতার মধ্যেই কি প্রগতিবাদী ভাবনার বীজ লুকিয়ে থাকে! এই প্রশ্নের কোনও উত্তর এখনও আমার জানা নেই।

