ড. রাজলক্ষ্মী বসু
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কেন বিরোধীদের এত মাথাব্যথার তা কে না বুঝছি। শেষমেশ সেই তো আঁচড়টা পড়বে ব্যালট বাক্সে। নিপীড়িত ওপাড়ের মানুষ। সহজ কথায় বাঙাল ভোট পাবে গুজরাটের শীর্ষনেতারা। এতেই বুঝি প্রধান বিরোধী শক্তি কংগ্রেসের শিরপীড়া? কংগ্রেস যে কোনও জাতীয় সংশোধনের কি মাত্রায় বিরোধিতা করতে সক্ষম, তার একটা নমুনা দিই। মুসলিম পার্সোনাল ল অর্থাৎ শরিয়াত আইন রদের উদ্দেশ্যে যখন তাৎক্ষণিক তিন তালাক বাতিলের প্রস্তাব ওঠে তখন বিদগ্ধ কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের বিচক্ষণ লেখনী ব্যাখ্যা অভূতপূর্ব দেশপ্রেম এবং সর্ব্বৈ মুসলিম প্রেমের নিদর্শন রাখে। তাঁর যুক্তি ছিল— এক মুসলমান ব্যক্তি যদি সমান্তরাল চারজন স্ত্রী রক্ষা করেন তাতে কি করে মুসলিম সংখ্যাবর্ধিত হয়! কারণ প্রতিটি মহিলার তো প্রজনন ক্ষমতা জৈবিকভাবে নির্দিষ্ট। অর্থাৎ পার্সোনাল ল রক্ষা করার পক্ষে জোরদার যুক্তি। এও বলেন— The sad irony is that India’s secular coexistence was paradoxically made possible by the fact that overwhelming majority of Indians are Hindus…’ পাকিস্থানপন্থী বেশ কিছু কংগ্রেস নেতা এমন মন্তব্যও করেছেন যে, মধ্যযুগীয় মুসলমান আক্রমণে এদেশের বহু মন্দির স্থাপত্য ধ্বংস হয়েছে কিন্তু হিন্দুত্ব বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, ভারতীয় স্বপ্ন লাঞ্ছিত হয়নি। এত গৌরচন্দ্রিকা এই কারণেই যে, আশা করাই মুর্খামি যে, জাতির উন্নতির স্বার্থে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন সমর্থিত হবে কংগ্রেস বা তার সিস্টার ইউনিট তৃণমূল কংগ্রেস দ্বারা।
বিশ্বের কোনও প্রান্তেই বর্তমানের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বিষয়ে কোনও সমালোচনা বা জিজ্ঞাসা সৃষ্টি হয়নি। কারণ হারিয়ে যাওয়া মানুষের পুনরুত্থানের সম্মান ও সুস্থ জীবনদানের এ এক শালগ্রাম শীলা। যে স্পর্শমনিতে দোলাচলে থাকা মানুষের জীবন ‘বসবাসকারী’ থেকে ‘নাগরিক’-এ রূপান্তরিত হবে। কিন্তু কোনও নাগরিক যে ‘বসবাসকারী’-র তকমা পাবে এমনটা নয়। প্রাপ্তি যোগের যে এত বিরুদ্ধাচারণ হতে পাবে— এ তো বোধহয় যুগান্তকারী ঘটনা। ‘কাগজ আমি দেখাব না’ বলে যাঁরা হইচই করছেন, তাঁদের সমর্থনেই বলা— কেন দেখাবেন? কাগজ তো চাওয়াই হয়নি। অহেতুক কাগজ খুঁজতেও হবে না। শরণার্থীর জন্য তো এই আইন। শরণার্থীর কাগজ যে চাওয়া হয়নি। ওটা কেবলই অপপ্রচার। বিজ্ঞাপনের অর্থের অপচয় বরং এমনভাবে না করলেই ভালো হত।
এবার আসা যাক, ‘ক্যা ক্যা ছি ছি’ প্রসঙ্গে। ‘ক্যা ক্যা’-তে বিরোধিতা করা মানেই কি বিরোধী জোটের সাফল্য। উত্তর খুঁজি এ কলমে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন— If unity is not there still we have to move on & do whatever is necessary’. তার মানে— সহজ কথা ঐক্যের অভাব। বিরোধিতা নানান দিক থেকে শুরু হলেও এক বিন্দুতে বা লক্ষ্যে উপনীত হতে অক্ষম। কমন প্ল্যাটফর্ম তো বাইনোকুলারেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্যান ইন্ডিয়া প্রোটেস্ট বলতে কি সত্যিই এমন বলে? অভাব রয়েছে সাধারণ আগ্রহ এবং সিএএ-কে জোরগলায় সংবিধান বিরোধী বলার মতো প্রকৃত নেতার। সংবিধান স্বীকৃত বিষয়কে লিখিতভাবে অসাংবিধানিক বলাও যে অসাংবিধানিক। তা যে তাবড় বিরোধী নেতারা জানেন। তাই নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস কেউই অর্জন করছেন না। দিল্লিতে উত্তেজনা যতো বেশি হবে ভোট তত বেশি পদ্মকাননে জমা পড়বে। তাই ঝক্কি নিচ্ছেন না কেজরিওয়ালও। সিএএ (ক্যা) বিরোধিতা উল্লেখযোগ্যভাবে তিনটি স্তরে চলছে— ছাত্র সমাজ সম্মুখে দণ্ডায়মান। কম-বেশি তারা সবাই বাম মতাদর্শে বিশ্বাসী। সত্যি বলতে তাদের দাবি বা নীতি কিছুই পরিচ্ছন্ন না। বাম ছাত্র আন্দোলন সমর্থিত হচ্ছে মূলত কংগ্রেস দ্বারা। প্রো-মুসলিম তকমার নব সংস্করণের ভয়েই কংগ্রেস সামনে অনুপস্থিত। দ্বিতীয় স্তরে আছেন তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। যারা ‘কাগজ দেখাবো না’ বলে ভুল প্রচারে ব্রতী। তৃতীয় স্তরে অবস্থান করছে— অন্যান্য বিরোধী দলগুলি, যারা প্ররোচিত করার ইন্ধন যোগাচ্ছে। সিএএ-এর ফলে যে কদর্য রাজনীতি তৃতীয় স্তরটি করছে তার ফলেই ধর্মবিদ্বেষ ভারতে মাথাচাড়া দিচ্ছে। রাহুল গান্ধি, মমতা ব্যানার্জি, সীতারাম ইয়েচুরি-সহ অন্যান্যদের ঝাড়খণ্ড মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের শপথবাক্য পাঠের দিন এক মঞ্চে দেখা গেলেও তার গতি বর্তমানে সিএএ নিয়ে বেশ মন্থর। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধি ১৩ জানুয়ারি সিএএ বিরোধী সমাবেশ করলেও তাতে সর্বসাকুল্যে কুড়িটি বিরোধী দল একজোট হয়। বলাবাহুল্য প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি, তেলেগু দেশম পার্টি, ডিএমকে, আম আদমি পার্টি সোনিয়া গান্ধির সেই আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিল না। বহুজন সমাজবাদী পার্টি দূরত্ব রক্ষা করে, কারণ রাজস্থানে কংগ্রেসের বিধায়ক কেনাবেচার পুরোনো ঐতিহ্য, ডিএমকে— আঞ্চলিক কংগ্রেসের উপর বিক্ষুব্ধ কারণ তারা মিডিয়ায় বিরোধিতা করে। শিবসেনা এবং এজিপি বিল বিরোধিতা করলেও তারা অবস্থান বদল করেছে। জেডিইউ প্রধান নীতিশ কুমার সিএএ সমর্থন করেন, যদিও তিনি এনআরসি বিরোধী। এনআরসি সংক্রান্ত কিছুর এখনও কেন্দ্র থেকে নির্দেশ অবশ্য নেই। এবং এনআরসি সমগ্র দেশবাসীর জন্য। সিএএ-এর মতো তা কেবল শরণার্থী সংক্রান্ত না। দুটি বিষয় পৃথক ক্ষেত্র। তাই আন্দোলনকারীরা সিএএ-এনআরসি মানব না বলাটাই ব্যাকরণগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। বিস্ময়ের বিষয়, আসাউদ্দিন ওয়েসি সিএএ-এর শুরুতে বিরোধিতা করলেও কোনও ধরনায় বা বিক্ষোভে অবস্থান করেননি। সাংবিধানিক পদ্ধতিতে তিনি সংসদে প্রশ্ন-বিতর্কতেই সীমাবদ্ধ। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জগমোহন রেড্ডিও সিএএ-এর সমর্থন করেছেন। তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও কিছুটা প্রশমিত পুরো বিষয় নিয়েই। কি বিচিত্র বিরোধিতা! জাতীয় বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসের সর্বাগ্রে মূল ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কাকে দিয়েছে রাজার পাঠ। প্রায় প্রত্যেকটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলেরই ওই কংগ্রেস নামক দলটির প্রতি আন্তরিক আস্থা নেই। প্রধান কারণ, বিলের বিরোধিতার পুরোটাই ক্রেডিট হবে কংগ্রেসের খাতায়। তাই বিরোধিতা ক্যা ক্যা ছি ছি হয়েই স্থগিত। মাখন খাবে ছিন্নমূল মানুষ। ভোট পাবে গুজরাটের ‘মোটা ভাই’।
