ব্রাইডাল মেকআপ-এ দমদমের মডেল তিয়াসা শোরগোল ফেলে দিয়েছে

মামন জাফরান

দমদমের পূর্ব সিঁথি রোডের মধুগড়ের বাসিন্দা তিয়াসা দাস এখনও বারো ক্লাসের ফাইনাল পরীক্ষা দেয়নি। অর্থাৎ সে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। হিন্দি ছবির পোকা। এই মেয়ে দমদম এলাকায় ব্রাইডাল শুটের মডেল হিসেবে রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। চলতি বছরেই তার এক বন্ধু মৌসুমী নায়েক এবং প্রিয়াঙ্কা দাস— এই দু-জন মেকআপ আর্টিস্ট তাকে কনে সাজিয়ে পরপর সাত-আট বার মডেল হিসেবে ছবি তুলেছে। সেই ছবি দেখে এলাকার মডেলদের মধ্যে রীতিমতো চাঞ্চল্য। অনেকেই জানতে চাইছেন এ মেয়ের হালহকিকত। কি করে? কোথায় থাকে? গ্রুমিং কোথায়? পারিবারিক পরিচিতি কি? ফ্যামিলিতে আর কেউ মডেলিং করে কিনা ইত্যাদি। কারণ যে দক্ষতা এবং নৈপুণ্যে তিয়াসা ব্রাইডাল শুটে পোজ দিয়েছে, তাতে মেকআপ আর্টিস্টরা তো বটেই, ক্যামেরাম্যানরাও হতভম্ব। কারণটা হল, এ মেয়ে আর যাই হোক, মডেল হিসেবে কোনওদিন কোনও জায়গায় কোনও গ্রুমিং সেন্টারে যায়নি। নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সাধারণ এক মেয়ে কিভাবে এমন দক্ষ মডেল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনা করে ফেলল, সেটা জানতেই আমরা কথা বলি তিয়াসার সঙ্গে। সে অকপটে যা জানাল তা হল, হিন্দি ছবি দেখি। বলিউডের অভিনেত্রীদের যা স্মার্টনেস এবং দক্ষতা সেটা আমাকে মুগ্ধ করে। তার প্রিয় অভিনেত্রীদের মধ্যে রয়েছে আলিয়া ভাট, ঐশ্বর্য রাই, ইলিয়ানা ডিক্রুজ। এই তিন জনই কখনও না কখনও কোনও না কোনও সময়ে মডেল হিসেবে আসর মাতিয়েছেন। তা সে বাস্তব জীবনেই হোক বা ছবির পর্দায়। তাদের দেখেই বা বলতে গেলে নকল করেই তার মডেলিং-এর হাতেখড়ি। বাবা নন্দগোপাল দাস একটি খাবারের দোকানের কর্মচারী। মা অম্বিকা দাস গৃহবধূ। আদতে পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরের বাসিন্দা এই পরিবারটি ভয়ংকর কনজারভেটিভ। সেই কারণেই মডেলিং-কে পেশা হিসেবে মেনে নেবে, এটা পরিবারের কাছ থেকে তিয়াসা এবং তার ছোটো বোন রূপসা কেউই আশা করে না। তবু মডেল হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ায় সে যেমন একদিকে অবাক, অন্যদিকে অনেকটা আত্মপ্রত্যয়ী। নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়ে হিসেবে যদি চাকরি খুঁজতে হয়, কোনও ব্যবসার সূত্র ধরতে হয়, অর্থাৎ খাবারের জোগাড়ের জন্য ইনকামের রাস্তা বাছতে হয়, তাহলে সেটা কেন মডেলিং হবে না, এই প্রশ্ন ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রীটিকে প্রতিদিনই পীড়া দেয়। দমদম কুমার আশুতোষ ইনস্টিটিউশন ব্রাঞ্চ-এর ছাত্রী তিয়াসার বন্ধুবান্ধব সকলেই তার মডেলিং-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাড়িতে বয়োজ্যেষ্ঠরা পছন্দ না করলেও দিদি-দাদা স্থানীয়রা তার ছবি দেখে দারুণ উচ্ছ্বসিত। কিন্তু এ তো গেল একদিক। তিয়াসা জানাল, তার বাবা নন্দগোপালবাবু মডেলিং-এর ডেড এগেনস্টে। অর্থাৎ তিনি কিছুতেই মেয়েদের এই পেশায় আসতে দিতে চান না। তবে মা রাজি না হলেও কিছুটা নরম মনের। তিনি চান, মেয়েরা যদি অভিনয় করে, তাহলে তবুও একটা কথা। কিন্তু মডেলিং মানে সেজেগুজে নানারকম পোশাক পড়ে ঘুরে বেড়ান, এটা দিঘার কাছাকাছি রামনগরের গ্রামীণ পরিবেশে আত্মীয়দের সামনে খুব একটা সম্মানজনক হবে না বলে তাঁর ধারণা। অর্থাৎ এক চরম মানসিক দ্বন্দ্ব রয়েছে পরিবারের মধ্যে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিয়াসা চায় সে মডেলিং করবে এবং ইতিমধ্যেই ব্রাইডাল শুটে কাজ করে যে প্রশংসা এবং সমর্থন সে কুড়িয়েছে, সেটাকে পাথেয় করেই আরও এগিয়ে যাবে। ২০১৮ সালে প্রথম একজন মেকআপ আর্টিস্ট তিয়াসাকে দেখে তাকে মেকআপ করিয়ে মডেল হিসেবে কিছু ছবি তোলেন। সেই শুরু তিয়াসার। তখনও এইসব কাজে কোনও পয়সাকড়ি সে পায়নি। তিয়াসা জানিয়েছে, আমার সাজতে ভালো লাগে। তাই মেকআপ আর্টিস্টরা যখন আমাকে কনে সাজাবো বলল, আমি রাজি হয়ে গেলাম। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা এক একবার মেকআপ করার জন্য চুপচাপ বসে রইলাম। সাজানো হয়ে গেলে নানান রঙের বেনারসি, গয়না ইত্যাদি পরিয়ে আমার ছবি তোলা হল। আমি ভাবিইনি যে এই ছবিগুলো এতটা নাম করবে। তিয়াসার বোন রূপসাও জানালো, দিদির সামান্য ব্রাইডাল মেকআপের ছবি যে এইভাবে মডেল দুনিয়ায় ভাইরাল হবে, সেটা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। প্রসঙ্গত, রূপসাকেও ব্রাইডাল মেকআপে সাজিয়ে মডেল বানিয়ে ছবি তোলা হয়েছে। সে ছবি নিয়েও যথেষ্ট আলোড়ন পড়েছে। সেই প্রসঙ্গ পরে একদিন আসব। এদিকে তিয়াসার ওই ছবিগুলি দেখেই তার কাছে কাজের অফার ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছে। অনেকেই জানতে চান, সে কি শুধুই ব্রাইডাল মডেল হবে, নাকি বোল্ড, সেমি বোল্ড, ফাইন আর্টস, লিঙ্গারিজ ইত্যাদি মডেলিংও করবে। তিয়াসা এই মুহূর্তে এই শব্দগুলো নতুন শুনছে। সে জানাল, আপাতত উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ব্যস্ততা নিয়েই সে সময় কাটাচ্ছে। সামনেই মার্চ মাসে পরীক্ষা। সেটা মিটলে তারপর সিরিয়াসলি এই বিষয়টা নিয়ে ভাববে। তবে এটা তিয়াসা ঠিক করেই নিয়েছে যে, যাই করি, বাড়ির লোকদের কষ্ট দিয়ে কিছু করবে না। আবার মডেলিং-টাও একদম ছেড়ে দেবে, তাও না। কথায় কথায় সে আরও জানাল, বাড়ি থেকে ইতিমধ্যেই সম্বন্ধ দেখছে। সেটা হলে তো সব গেল।

Leave a comment