মামন জাফরান

ঠিক হয়েছিল, রবীন্দ্র সদনের পাথরের সিঁড়ির সামনে ফোয়ারার পাশে বসে কথা হবে। সেই মত নিউ আলিপুর—বুড়ো শিবতলা থেকে ঠিক সময়ে পৌঁছে গেল রাখী। তারপর নন্দনের সামনের গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ-দিকে মোড় নিয়ে হনহন করে এগিয়ে আসতে থাকে। পরনে খুব সাধারণ পোশাক, জিন্সের প্যান্ট এবং গাঢ় সবুজ রঙের সিল্কের টপ। পায়ে চার ইঞ্চি হিলের জুতো। পাঁচ ফুট দু-ইঞ্চির উচ্চতার মেয়েটির হাঁটায় দারুণ সপ্রতিভতা, স্মার্টনেস। মুখশ্রীতে যেন দেবীর কল্পরূপ। টান টান গায়ের চামড়ায় আক্ষরিক অর্থে আপেল ধোওয়া দুধে-আলতা রঙ। রবীন্দ্র সদনের গানমেলায় হাজির কয়েক হাজার মানুষ হাঁ করে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। কিন্তু তাদের বিস্ময়ের আড়ালেই রয়ে গেল যে কথাটা, সেটাই এই মেয়ের সাম্প্রতিকতম পরিচয়। নাম রাখী শাহ। বয়স ৩৭। বিবাহিতা, স্বামী সিদ্ধার্থ শাহ এবং পুত্র ক্লাস সেভেনের ছাত্র শ্রেষ্ঠকে নিয়ে থাকেন নিউ আলিপুরে। তাঁর শ্বশুরমশাই বিশ্বনাথ শাহ এবং শাশুড়ি চন্দ্রিকা শাহ একসঙ্গেই থাকেন। প্রায় চার পুরুষ গড়িয়ে গেল এই পরিবার কলকাতার বাসিন্দা। তাঁদের আদি নিবাস ছিল কাশ্মীর। সম্ভবত, গাত্রবর্ণের এমন দ্যুতি সেই কারণেই। এমনই এক পরিবারের গৃহবধূ রাখী শাহ কিছুদিন আগেই মুম্বাই থেকে এ আর মিসেস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় বাংলার সেরা সুন্দরী হিসেবে মিসেস ওয়েস্ট বেঙ্গল খেতাব জয় করে এসেছে। তার আগে আগস্ট মাসে এফ ফেস্ট আনোখি প্রতিযোগিতায় সেকেন্ড রানার্সআপ হয়েছিল এই সুন্দরী। তারও আগে গোয়া থেকে মিসেস গ্ল্যামারাস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এ রাজ্যের সেরা বাছাই পাঁচ জনের মধ্যে রাখী ছিল অন্যতম। এইসব সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলি থেকে বেশ কয়েকটি সাব টাইটেলও জিতে নিয়েছেন কলকাতার এই সুন্দরী। তার মধ্যে রয়েছে, মিসেস কনজিনিয়াল, মিসেস গ্ল্যামারস আইস, মিসেস চার্মিং ইত্যাদি। সাফল্যের মুকুটে এতগুলো পালক জোটানোর পরও এক বিন্দু অহংকার বা ঔদ্ধত্য নেই মেয়েটার। কথা বলতে শুরু করলে মনে হবে, খুব আটপৌরে একটা বাঙালি ঘরের মেয়ে যেন আড্ডা মারছে। জানতে চাইলাম, এতগুলো পুরস্কার পেলে, তোমার গ্রুমিং হয়েছিল কোথায়? নিষ্পাপ একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে রাখী বলল, সেই অর্থে গ্রুমিং তো হয়নি, ছেলের পড়াশোনা, ঘরসংসার, রান্নাবান্না, শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন এইসব নিয়েই আমার কেটে যাচ্ছিল। তবে মনে মনে বিউটি পেজেন্টেসে নাম দেওয়ার নাম দেওয়ার একটা ইচ্ছে ছোটোবেলা থেকেই ছিল। সবমেয়েই চায় সুন্দরী হিসেবে তাকে লোক অ্যাপ্রিসিয়েট করুক। কিন্তু তার জন্য কোনও কসরত বা প্রাণপণ চেষ্টা কিছুই কোনওদিন করিনি। দক্ষিণ কলকাতার খালসা গার্লস স্কুল থেকে বারো ক্লাস পাশ করি ২০০০ সালে। তারপর শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজ থেকে বি.কম-এ অনার্স গ্র্যাজুয়েট। আমার পড়াশোনা বলতে এই পর্যন্ত। কিন্তু অঙ্ক আমার ভীষণ প্রিয় সাবজেক্ট। আমি অঙ্ক করতে ভালোওবাসি আর পারিও। তাই বাড়িতেই একটা প্রাইভেট কোচিং সেন্টার খুলেছি। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের শুধুই গণিত পড়াই। আমার ছেলেও পড়াশোনায় দারুণ। কোনওদিন সেকেন্ড হয়নি। ২০০৫-এ আমার বিয়ে হল। দু-বছর যেতে না যেতেই মা হলাম। বিউটি পেজেন্টস-এর জন্য গ্রুমিং করবোটা কখন? ওই একবার পায়েল ভার্মার ইনস্টিটিউটে ক-দিনের জন্য গিয়েছিলাম। সংসার করে সময় নেই, ব্যাস বন্ধ হয়ে গেল।

তাহলে পুরোদস্তুর গৃহবধূ এবং সংসারী হয়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় এলে কেন? কিভাবে? রাখী জানাল, আমার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি বরাবরই বিউটি পেজেন্টেস-এ যাওয়ার জন্য আমায় উৎসাহ দিত। কি জানি, ওদের চোখে হয়ত আমি খুব সুন্দরী। কিন্তু আমার বাবা বীরেন্দ্র প্রসাদ শাহ, মা সরিতা শাহ, ভাই বিবেক শাহ— এরা প্রথমটায় এসব ভালো চোখে দেখত না। প্রশ্ন করলাম, তোমার বাপের বাড়ির পদবিও শাহ, শ্বশুরবাড়িরও শাহ? আবার রাখী হেসে বলতে শুরু করল, হ্যাঁ, তো। আমার বাবা এবং শ্বশুরমশাই দুজনে ক্লাসমেট ছিল। খুব ছোটোবেলার বন্ধু। আমরা শাহ-রা সবাই কাশ্মীরের বাসিন্দা ছিলাম। সোনমার্গের কাছে একটা গ্রামে আমাদের বিরাট খেত ছিল। তাতে জাফরান চাষ হত। তারপর কাশ্মীরে গণ্ডগোল শুরু হতে আমাদের সেই গ্রামের সবাই ছিটকে গেল। আমার শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির পূর্বপুরুষরা সব কলকাতায় চলে আসেন। বাদবাকি কেউ কেউ যান ইউপি-তে, কেউ বিহারে, কেউ দিল্লিতে। আমাদের কিন্তু বিরাট জাফরানের ব্যবসা ছিল। সব বেহাত হয়ে যায়। তারপর থেকে এই বাংলায় আমরা ৭০ বছরেরও বেশি রয়েছি। পুরো বাঙালি হয়ে গেছি। মাছ, মাংস, ডিম সব খাই। বাঙালি রান্না দারুণ লাগে। শুক্তো, ছেঁচকি রান্না করতে পারি। দুর্গাপুজোয় বাঙালিদের মতো আমাদেরও আনন্দ কম হয় না। আমার ননদ মিতা শাহ-র বিয়ে হয়েছে বাঙালি ঘরে। পাত্রের নাম অর্ক বিশ্বাস। তারা নিউজিল্যান্ডে থকে। অবাক বিস্ময়ে স্মৃতিচারণ শুনতে শুনতে মনে হল ভূস্বর্গের সেই বিরাট খেতের মালিকরা নিজ ভূম ছেড়ে চলে এসে এখন কি করছেন? কিভাবে সংসার চালাচ্ছেন? এসব তো কোনওদিনই ভাবিওনি। আমায় একটু চিন্তিত দেখে, রাখী বলে উঠল, জানেন তো আমাদের পরিবারের অধিকাংশই ব্যাঙ্ক চাকুরে। বাবা পিএনবি-তে ছিলেন, ভাই ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অব কমার্স, ভ্রাতৃবধূ প্রিয়াঙ্কা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া— এই অবাঙালি বঙ্গসুন্দরীর মুখে তাঁর পরিবারের ব্যাঙ্ক প্রীতির কথা শুনে বুঝলাম কেন এত বিষয় থাকতে গণিতের প্রতি তাঁর এত আকর্ষণ এবং আনন্দ। তুমি আর কিছু কর না? নাচ, গান, ছবি আঁকা? হ্যাঁ, নাচ তো ছোটোবেলা থেকেই জানি। টানা ছ-বছর নাচ শিখেছি। বাড়ির কাছে অঞ্চলা বলে একটা স্কুল ছিল। সেখানে ক্লাসিক্যাল, সালসা, বলিউড— সবরকম নাচ শিখেছি। নিয়মিত যোগাভ্যাসও করি। এই যে শীতকাল এল, আমাদের বাড়ির কম্পাউন্ডে ব্যাডমিন্টন খেলা শুরু হবে। এই সময়টা আমি চুটিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলি। সেভাবেই নিজেকে ফিট রাখি। আচ্ছা মুম্বাই থেকে এত বড়ো একটা খেতাব জেতার পর তৎক্ষণাৎ তোমার কি রিকায়শন হয়েছিল? কি মনে হয়েছিল? রাখী একটু মুচকি হেসে বলল, দেখুন, ভালো তো লাগবেই। এত বড়ো একটা সম্মান পেলাম, আমি চেষ্টা করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু পাবোই যে তা তো আর জানা ছিল না। তবে একটা ঘটনা বলি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর আমাদের ফিনালে ছিল মুম্বাইতে। তার আগে ১০ সেপ্টেম্বর একটা ইভেন্ট ছিল। Ramp তার সঙ্গে ডান্স। আমি যখন শুরু করতে যাব, দেখলাম ফিসফাস গুঞ্জন। কেউ কেউ বলছে, এ কলকাতার মেয়ে, এ আর কি করবে? নানারকম টুকরো-টাকরা আওয়াজ ভেসে আসছে। তারপর যেই শুরু করেছি, ব্যাস। সবাই দেখি, একদম উল্টো রিয়াকশন দিচ্ছে। হাততালিতে পুরো হল ফেটে পড়ল। তখন আমার মনে হল, কলকাতার মেয়ে বলে নিচু চোখে দেখার যোগ্য জবাবটা আমি দিতে পারলাম।
আচ্ছা এর পরে কী ভাবছ? এবার কি করবে? মডেলিং থেকে অনেকেই অভিনয়ে আসে। তুমি কি তেমন কিছু ভাবছ? রাখীর সোজা কথা, আমি ভেবেছি আর কিছুদিন মডেলিং-এ থাকব, হয়ত। তারপর পুরোটাই অভিনয় জগতে চলে আসব। আমাদের খুব কাছের মানুষ চলচ্চিত্র পরিচালক সুজিত গুহ। পারিবারিক বন্ধু বলতে পারেন। দু-মাস আগে উনি ওনার একটা ছবির জন্য আমাকে বলেছেন। উনি আমাকে অভিনয় শেখার জন্য টালিগঞ্জের ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে বলেন। আমি সবে ওখানে ক্লাস করতে শুরু করেছি। এই ডিসেম্বরেই শিলিগুড়িতে চলচ্চিত্র উৎসব হবে। সেখানে সুজিত গুহ আমন্ত্রিত। আমিও বিশেষ অতিথি হিসেবে যাচ্ছি। সম্ভবত পুরস্কার বিতরণী বা তেমন কিছু দায়িত্ব আমায় দেওয়া হবে। এ ছাড়া আর একটা কথা বলি, কাশ্মীর থেকে কলকাতা তারপর কলকাতা হয়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় সেরা সম্মান জেতা— জার্নিটা নিয়ে সুজিতবাবু আমার উপরেই একটা ছবি করবেন বলে ভাবছেন। শেষ পর্যন্ত কি হবে জানি না। তবে ওনার ভাবনায় আছে। দেখা যাক, কি হয়। এতক্ষণ গল্প করার পর রাখীকে বললাম, তোমায় দেখে অবাঙালি মনে হলেও এত সুন্দর স্পষ্ট বাংলা বল যে গুলিয়ে যায়। প্রত্যুত্তরে কলকাতাবাসী কাশ্মীরী এই সুন্দরী মডেল কন্যা জানিয়ে দিল, বাংলা বড়ো মিষ্টি ভাষা। বাঙালি বড়ো আপন করে নিতে জানে। তাই আমরাও এখন বাঙালি।
